দিনটি ২০১৪ সালের ৫ জুলাই। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে দিনটি এক গভীর ক্ষতের নাম। সেদিন ফোর্তালেজার এস্তাদিও কাস্তেলাওয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিল মুখোমুখি হয়েছিল কলম্বিয়া। কোয়ার্টার ফাইনালের মত গুরুত্বপূর্ণ ওই ম্যাচে ব্রাজিলের মূল তারকা নেইমারের মেরুদণ্ডের হাঁড় ভেঙে দিয়েছিল কলম্বিয়ার খেলোয়াড় জুনিগা।
সেদিন শুধু নেইমারের মেরুদণ্ডের হাড়ই ভাঙেনি কলম্বিয়ান ফুটবলার জুনিগা ভেঙেছিল দিয়েছিল কোটি ব্রাজিল সমর্থকের হৃদয়, কোটি মানুষের স্বপ্নও। ওই ঘটনা থেকে স্বাগতিক ব্রাজিলের পতনেরও শুরু হয়। শুধু তাই নয় ঐ ঘটনার পর নেইমারের ক্যারিয়ারও পড়েছিল হুমকির মুখে।

ম্যাচের শেষ দিকে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার হুয়ান ক্যামিলো জুনিগার একটি ট্যাকল শুধু একজন ফুটবলারের বিশ্বকাপই শেষ করে দেয়নি, বদলে দিয়েছিল পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ। ভেঙ্গেছিল কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তের হৃদয়ও।
সেদিনের ওই ঘটনার পর আর মাঠে নামতে পারেননি নেইমার। এর মাত্র চারদিন পর সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক ৭-১ গোলের লজ্জার হার দেখেছিল ব্রাজিল। অনেকের মতে, সেই বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল নেইমারের মেরুদণ্ডে জুনিগার হাঁটুর আঘাতেই। ওই ঘটনায় নেইমার ইনজুরিতে না পড়লে ২০১৪ বিশ্বকাপের গল্পটা অন্যরকম হতেও পারতো।
২০১৪ বিশ্বকাপের স্বাগতিক ছিল ব্রাজিল। পুরো দেশের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ২২ বছর বয়সী নেইমার। গ্রুপ পর্বে চার গোল করে দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি। চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল দুর্দান্ত ছন্দে থাকা কলম্বিয়া, যার নেতৃত্বে ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হামেশ রদ্রিগেজ।
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল প্রচণ্ড শারীরিক লড়াই। ব্রাজিল এগিয়ে যায় থিয়াগো সিলভা ও ডেভিড লুইজের গোলে। কলম্বিয়ার হয়ে হামেশ রদ্রিগেজ পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করেন। কিন্তু ম্যাচের ফলের চেয়েও বড় খবর হয়ে ওঠে শেষ কয়েক মিনিটের একটি মুহূর্ত।
ম্যাচের তখন ৮৮তম মিনিট। মিডফিল্ডের দিকে একটি লম্বা বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন নেইমার। ঠিক তখনই পেছন দিক থেকে লাফিয়ে উঠে হাঁটু দিয়ে তার পিঠের নিচের অংশে আঘাত করেন কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার হুয়ান ক্যামিলো জুনিগা।
আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নেইমার। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন তিনি। চিকিৎসকরা মাঠে ছুটে এলেও তিনি আর দাঁড়াতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়তে হয় ব্রাজিলিয়ান তারকাকে। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।
স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শক মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ব্রাজিলের ফুটবলারদের মুখেও নেমে আসে উদ্বেগের ছাপ।
ম্যাচ শেষে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরীক্ষায় দেখা যায়, নেইমারের মেরুদণ্ডের তৃতীয় কশেরুকা (L3 vertebra)-তে ফ্র্যাকচার হয়েছে। ব্রাজিল দলের চিকিৎসক রদ্রিগো লাসমার জানান, মাত্র দুই সেন্টিমিটার এদিক-ওদিক হলে নেইমারের ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যেতে পারত। আরও গুরুতর হলে তিনি স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্তও হতে পারতেন।
চিকিৎসকদের ভাষায়, আঘাতটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। তবে সৌভাগ্যবশত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি।
হাসপাতালে শুয়ে ভিডিও বার্তায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নেইমার। তিনি বলেন, ‘আমার একটি স্বপ্ন ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন। এখন আর মাঠে নেমে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমার সতীর্থরা সেটি পূরণ করবে।’
পুরো ব্রাজিল তখন শোকে স্তব্ধ। দেশের সংবাদমাধ্যম থেকে সাধারণ সমর্থক- সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন নেইমার।
ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েন হুয়ান ক্যামিলো জুনিগা। তবে তিনি দাবি করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করেননি। জুনিগা বলেন, ‘আমি কখনও কাউকে আহত করার জন্য খেলি না। মাঠে যা হয়েছে, সেটা ফুটবলের অংশ। আমি ইচ্ছা করে নেইমারকে আঘাত করিনি।’ নেইমারের বাবা-ও পরে জানান, জুনিগা ব্যক্তিগতভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল রেফারির সিদ্ধান্ত। স্প্যানিশ রেফারি কার্লোস ভেলাসকো কারবাইয়ো জুনিগাকে কোনো লাল কার্ড তো দূরের কথা, হলুদ কার্ডও দেখাননি। পরে ফিফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন পেলেও জানায়, রেফারি ঘটনাটি দেখেছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই নিয়ম অনুযায়ী পরে আর শাস্তি দেওয়া সম্ভব ন্রিহি
নেইমারের অনুপস্থিতির ধাক্কা ব্রাজিল সামলে উঠতে পারেনি। এর সঙ্গে সেমিফাইনালে অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাও (দুই হলুদ কার্ডের কারণে) ছিলেন নিষিদ্ধ। ফলে জার্মানির বিপক্ষে দুই প্রধান তারকাকে ছাড়াই মাঠে নামে স্বাগতিকরা।
বেলো হরাইজন্তেতে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল। প্রথম ২৯ মিনিটেই পাঁচ গোল হজম করে তারা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, নেইমারের অনুপস্থিতি শুধু কৌশলগত নয়, মানসিকভাবেও দলটিকে ভেঙে দিয়েছিল।
আজও ২০১৪ সালের ৫ জুলাইয়ের সেই দৃশ্য বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। জুনিগার হাঁটুর আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়া নেইমার, স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়ার সময় তার অশ্রুসিক্ত মুখ এবং পুরো ব্রাজিলের হতাশা- সবই ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত সেবার চতুর্থ স্থান নিয়েই বিশ্বকাপ শেষ করে। আর নেইমারের জন্য ২০১৪ বিশ্বকাপ হয়ে থাকে এক অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প- যেখানে শিরোপার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রতিপক্ষের একটি ট্যাকল।
সমর্থকদের মতে, ব্রাজিল স্বাগতিক দল হওয়া সত্ত্বেও এতটা ভরাডুবি হতো না। স্বপ্নটা সেদিন এভাবে থেমে যেত না, ২০১৮ ও ২০২২ সালের ফলাফলও ভিন্ন হতে পারতো, নেইমার জিততে পারতো অনায়াসে বেশ কয়েকটা ব্যালন ডি’অর, নেইমার থাকতো সর্বকালের সেরাদের শীর্ষে, ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকত এক ভিন্ন গল্প। কিছু ক্ষত শরীরে লাগে, আর কিছু ক্ষত থেকে যায় হৃদয়ে। ২০১৪ সালের সেই মুহূর্তটা ব্রাজিল ভক্তদের জন্য ঠিক তেমনই এক না-ভোলা চিরকালের কষ্ট।

