উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষের সম্ভাবনা এবং এর মূল্য শৃঙ্খল উন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে রাজধানীতে জাতীয় সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করেছে কেয়ার বাংলাদেশ। এইচএসবিসি বাংলাদেশের সহযোগিতায় আয়োজিত সিম্পোজিয়ামের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে সূর্যমুখীর ভ্যালু চেইনের সম্ভাবনা উন্মোচন’।
সিম্পোজিয়ামে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং কৃষক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল ফসল হিসেবে সূর্যমুখীর সম্ভাবনা, এর মূল্য শৃঙ্খল উন্নয়ন এবং দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাম দাস। তিনি বলেন, “সূর্যমণি প্রকল্প দেখিয়েছে, কোনো ফসলের সফল চাষাবাদ নিশ্চিত করতে কৃষকদের জন্য মানসম্মত উপকরণ, কারিগরি সহায়তা, যান্ত্রিক সুবিধা এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করে একটি কার্যকর ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা প্রয়োজন। আজকের এই আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলেও এ মডেল সম্প্রসারণের পথ সুগম হবে বলে আমি আশাবাদী।”
সিম্পোজিয়ামে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলার তালা ও কলারোয়া উপজেলায় বাস্তবায়িত ‘সূর্যমণি’ প্রকল্পের অর্জন, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরা হয়। কেয়ার বাংলাদেশ ও এইচএসবিসি বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে দেখা গেছে, সূর্যমুখী উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য একটি লাভজনক ও জলবায়ু-সহনশীল ফসল, যা দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৫৮০টি কৃষক পরিবার ১৯০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে ৪৫০ মেট্রিক টনের বেশি বীজ উৎপাদন করেছে। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ, উন্নত কৃষি উপকরণ, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা, বাজারসংযোগ এবং নারীনেতৃত্বাধীন অভিযোজনভিত্তিক পারিবারিক সবজি বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সূর্যমুখীর মূল্য শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃহত্তর পরিসরে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণের জন্য একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক মডেল তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. রাশিদা ফেরদৌস। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততার সমস্যা মোকাবিলায় এ প্রকল্প আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। বাজারসংযোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর বাজারজাতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এইচএসবিসি ব্যাংক বাংলাদেশের চিফ অপারেটিং অফিসার দেবেশ মাথুর। তিনি বলেন, “সূর্যমণি প্রকল্পের সাফল্য উদযাপন করতে পেরে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি কৃষক পরিবার উপকৃত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি কৃষকদের জীবিকা শক্তিশালী করা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পদ্ধতির বিস্তার এবং কৃষি সম্প্রদায়ের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পলিসি অ্যাডভাইজর হারুনি ওসমান বলেন, “সরকারের কৃষি বিভাগের মাধ্যমে এ উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করা, সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় এ উদ্যোগ সফলভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।”
ব্রিটিশ হাইকমিশন, ঢাকার ডেভেলপমেন্ট কাউন্সেলর ও ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডসন বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং একটি শক্তিশালী ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ ভবিষ্যতে টেকসই কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
সিম্পোজিয়ামের ইন্টারঅ্যাকটিভ আলোচনায় সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষক প্রতিনিধিরা সূর্যমুখীর মূল্য শৃঙ্খল সম্প্রসারণে বাজারব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, অর্থায়ন, যান্ত্রিকীকরণ এবং সহায়ক নীতিগত পরিবেশ জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র কৃষকের জীবিকা উন্নয়ন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং আমদানিনির্ভর ভোজ্যতেলের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সিম্পোজিয়ামের সমাপ্তি ঘটে।

