রাতভর টানা বৃষ্টিতে কয়েক দিনের ভ্যাপসা গরম ও বৈরি আবহাওয়া থেকে স্বস্তি ফিরেছে খুলনাবাসীর জনজীবনে। তবে টানা বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) কর্মজীবী মানুষ ও যানবাহন চালকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী ৪৮ ঘণ্টায় আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ৪ থেকে ৫ দিনে টানা বর্ষণ হলেও বুধবার দিবাগত রাত থেকে খুলনায় বৃষ্টি শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে নতুন ড্রেন তৈরি করা হলেও নগরীর বয়রা বাজার মোড় থেকে খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালের (নেভি স্কুল মোড়) পর্যন্ত হাঁটু পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে অফিসগামী ও কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
নগরীর বয়রা এলাকার ইজিবাইকচালক আব্দুল হাদিস বলেন, পেটের দায়ে সারারাত বৃষ্টির পরও রাস্তায় নামতে হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় ঝুঁকি নিয়ে ইজিবাইক চালাতে হয়েছে। ব্যাটারিতে পানি ঢুকে গেলে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রিকশাচালক মিলন মিয়া বলেন, বৃষ্টিই কী আর রোদই কী, আমাদের রিকশা চালিয়ে খেতে হয়। রিকশা না চালালে খাব কি?
সকালে মোটরসাইকেলে করে ব্যাংকে যাওয়ার পথে পথচারী হোসাইন বলেন, সারারাতের বৃষ্টিতে গরম থেকে স্বস্তি মিলেছে। কৃষির জন্যও এই বৃষ্টি খুবই উপকারী, বিশেষ করে আমন চাষে এর সুফল মিলবে। তবে খুলনার রয়্যাল মোড়ে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। আজও সেখানে জলাবদ্ধতার কারণে অফিসে যেতে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। প্রতি বর্ষায় একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিদর্শন কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. মিজানুর রহমান বলেন, খুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু বর্তমানে সক্রিয় থাকায় আগামী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আরও বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নিম্নাঞ্চলে সাময়িক জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনার উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এই বৃষ্টিপাত কৃষির জন্য অত্যন্ত উপকারী। বিশেষ করে আমন মৌসুমের বীজতলা তৈরিতে কৃষকদের অনেক সুবিধা হবে। বৃষ্টি না হলে সেচের ওপর নির্ভর করতে হতো, এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। তবে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে কিছু পেঁপে গাছের গোড়া নরম হয়ে হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া এই বৃষ্টিতে ফসলের তেমন কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, খুলনা নগরীতে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, জোয়ারের সময় বৃষ্টির পানি দ্রুত রূপসা নদীতে নিষ্কাশিত হতে না পারা। এর সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, খাল-নালা দখল ও ভরাট এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতাও বেড়েছে। তবে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সমন্বিত জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, খাল-নালা পুনরুদ্ধার এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন করা জরুরি।

