আইএমইডির সমীক্ষা

ট্যানারি স্থানান্তরের প্রভাবে গুরুতর দূষণে ধলেশ্বরী

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১

হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের ফলে রাজধানী এলাকার দূষণ কিছুটা হ্রাস পেলেও সাভার এলাকায় নতুন ধরনের পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় জনগণের মতে, ধলেশ্বরী নদীর পানি দূষিত ও কালো হয়ে গেছে, দুর্গন্ধ বৃদ্ধি পেয়েছে, জলজ প্রাণীর উপস্থিতি কমে গেছে এবং বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি স্থাপন করা হলেও এর কার্যকারিতা আংশিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্ল্যান্টের নকশাগত সক্ষমতার তুলনায় অধিক বর্জ্য প্রবাহ, অতিরিক্ত রাসায়নিক ও পানি ব্যবহার, কঠিন বর্জ্য সিইটিপি লাইনে মিশে যাওয়া, বিদ্যুৎ সংকট, দুর্বল অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে বর্জ্য শোধন কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা (৪র্থ সংশোধিত) প্রকল্পটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ অবকাঠামোগত উদ্যোগ, যা রপ্তানিমুখী চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ট্যানারি শিল্পের কারণে বুড়িগঙ্গা নদীসহ আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। এর ফলে পানি, বায়ু ও মাটির দূষণ বৃদ্ধি পায়, জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিবেশগত ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ প্রেক্ষাপটে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি মূলত জানুয়ারি ২০০৩ থেকে ডিসেম্বর ২০০৫ মেয়াদে ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হলেও বাস্তবে জুন ২০২১ পর্যন্ত মোট প্রায় ১৮ বছর ৬ মাস সময়ে বাস্তবায়িত হয়। একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১০১৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি), নর্দমা শোধনাগার (এসটিপি), কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এসডব্লিউএমএস), ডাম্পিং ইয়ার্ড, পানি শোধনাগার, অগ্নি নির্বাপণ কেন্দ্র, প্রশাসনিক ভবনসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যা প্রাথমিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে সময় ও ব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে প্রকল্পে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং বাস্তবায়ন বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় যে, ধলেশ্বরী নদীতে দূষণের পরিমাণ পরিবেশগত মানদণ্ড অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অধিকাংশ ট্যানারি এখনো এ মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ। এছাড়া ট্যানারিগুলোর মধ্যে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা ও সমন্বয়ের ঘাটতিও লক্ষণীয়। সমীক্ষায় অবৈধ আড়ত, মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা, কাঁচা চামড়া বাজারে অস্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ভবনের ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু না হওয়া, রেন্টাল নীতিমালার অভাব, অডিট আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু অবকাঠামোর অপূর্ণ ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। একইসঙ্গে স্লাজ ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ক্রোম ব্লক-এর দীর্ঘ মেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এখনো নিশ্চিত হয়নি, যা ভবিষ্যতে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাসমূহ বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, একাধিক সমস্যা রয়েছে যা শিল্পের কার্যক্রম ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জরিপকালে প্রায় ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তাদের বিদেশি বায়ার কমে গেছে যা রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়ার একটি গুরুতর ইঙ্গিত দেয়। ধলেশ্বরীর পানির মান যাচাই করে বলা হয়েছে, দূষণের কারণে পানিতে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সিইটিপি কিছু দূষণ সূচক হ্রাস করতে সক্ষম হলেও পরিবেশগত মানদণ্ডের সীমা পূরণ করতে পারছে না। বাইপাস ড্রেনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য নির্গমন পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এটি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

ইত্তেফাক/এমএস