গজারির অপর নাম শাল। গাছ কাটার পর গোড়া থেকে চারা গজানোর কারণে এর নাম গজারি হয়েছে মনে করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও মিয়ানমারে এ গাছ জন্মায়। আমাদের ভাওয়াল ও মধুপুরের গাজারি বনই দেশের বৃহত্ পত্রঝরা বনাঞ্চল। লাল মাটির পাহাড়, ছোট ছোট টিলা জমিতে গজারি ভালো জন্মে। তবে পানিতে এ গাছ বেশিদিন বাঁচে না। বসন্তের শুরুতেই সম্পূর্ণ গাছের পাতা ঝরে যায়। বসন্তের শেষে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে। সেইসঙ্গে গাছের আগায় ঝুমকোর মতো ফুলের কলি দেখা দেয়। গজারির নতুন পাতা ফুল নিয়ে প্রকৃতি ভরে উঠলে শুরু হয় সাঁওতাল গ্রামে বাহা উত্সব। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফোটা ফুলের ভারে গাছ নুয়ে পড়ে। ফুলের ঘ্রাণ মুগ্ধকর। ফুলের গায়ে সামান্য লোম থাকে। সাদা পাপড়ির সঙ্গে হলুদ রং মেশানো। ফল ধরে মে-জুন মাসে। গাছের তুলনায় ফল খুব ছোট। ফলের চারদিকে চরকার মতো পাতলা পাঁচটি পাখা থাকে। ফল পাকার পর বোঁটা থেকে খসে পাখায় ভর দিয়ে চরকির মতো উড়তে উড়তে দূরে চলে যায়। যেখানে পড়ে সেখানেই আপনাআপনি চারা গজায়। এভাবে প্রাকৃতিক নিয়মেই গজারির বংশ বিস্তার হয়।
বৈজ্ঞানিক নাম Shorea robusta। সরল কাণ্ডের গজারিগাছ মূলত বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। ৩০ থেকে ৩৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কাণ্ডের বেড় ২-৩ মিটার হয়ে থাকে। বাদামি রঙের পূর্ণ বয়স্ক গাজারি কাঠ শক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত হয়। ঘরবাড়ির খুঁটি, দরজা-জানালা, নৌকা ও আসবাবপত্র তৈরিতে উপযোগী। গজারির বড় পাতা ঠোঙা, চালের পিঠা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। গজারি গাছের কাণ্ড থেকে এক ধরনের আঠা বের হয়। এই আঠা দিয়েই ধূপ বানানো হয়। ধূপ আগুনে পোড়ানো হলে ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়া জীবানুনাশক। ধূপের ধোঁয়া মশা তাড়াতে কাজে লাগে। গজারি পাতায় রস কৃমিনাশক। ফলের গুঁড়া আমাশয় ভালো করে।
বর্তমানে ছোট হয়ে আসছে ভাওয়াল ও মধুপুরের গজারি বন। গজারি বন ধ্বংস করে ভূমিদস্যুরা উঁচু জমি দখল করে নিচ্ছে। বসন্তে গজারির পাতা ঝরে গেলে শুকনো পাতায় আকস্মিকভাবে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দেয়। এক আগুনে কয়েক কিলোমিটার এলাকা পুড়ে যায়। এভাবে তখন সমস্ত বনই পোড়ে। বড় গাছ ছাড়া গজিয়ে ওঠা সব চারা পুড়ে যায়। অপরাধীচক্র ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে বন ধ্বংস করে। এভাবে গজারি বনের জীববৈচিত্র্যও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গজারি বন বাঁচাতে হবে।
