ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে যুগে যুগে অনেক তারকা মিডফিল্ডার এসেছেন। ববি চার্লটন, পল গ্যাসকায়েন, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড কিংবা ডেভিড বেকহ্যামের মতো কিংবদন্তিরা নিজেদের ছাপ রেখে গেছেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে জুড বেলিংহাম যা করে চলেছেন; তা নতুন এক স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তিনি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযানের প্রাণভোমরায় পরিণত হয়েছেন।
২৩তম বিশ্বকাপের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে খেলা এই মিডফিল্ডার। গ্রুপ পর্বে দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে নকআউটের পথে এগিয়ে দেন। এরপর শেষ ষোলোতে সহআয়োজক মেক্সিকোর বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস ৩-২ গোলের জয়ে করেন জোড়া গোল। কোয়ার্টার ফাইনালেও থামেননি।
রোববার নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে আবারও দুই গোল করে একাই নিশ্চিত করেন ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ছয়টি ম্যাচ খেলেছেন বেলিংহাম। প্রতিটি ম্যাচেই নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, আগের ম্যাচগুলোর তুলনায় তিনি দিনকে দিন আরও ভয়ংকর হয়ে হয়ে উঠছেন। প্রি-কোয়ার্টার ও কোয়ার্টার ফাইনালে জোড়া গোল করা এর বড় প্রমাণ। এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে ছয় গোল করেছেন। শুধু গ্রুপ পর্বে ঘানা ও শেষ বত্রিশে ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে গোল পাননি। তবে ম্যাচ দুটি তিনি ছিলেন উজ্জ্বল।
বর্তমানে ৬ গোল নিয়ে বেলিংহাম ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোলের পুরস্কার গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সমানতালে লড়ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সঙ্গে। ৬ গোল করেছেন ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনও। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বেলিংহামের কাছে বড় লক্ষ্য দলকে বিশ্বকাপ জেতানো। ১৯৬৬ সালের পর দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষা ঘোচাতে মরিয়া ইংল্যান্ড। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে ইংল্যান্ড কেবল একজনের দল নয়। অধিনায়ক হ্যারি কেইন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আক্রমণে রয়েছে গতি ও বৈচিত্র্য, মাঝমাঠে বেলিংহামের সঙ্গে অন্যরাও দারুণ ছন্দে। তবু বড় ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা যাদের থাকে, বেলিংহাম এখন সেই কাতারেই নিজের নাম লিখিয়েছেন।
আগামী বুধবার রাতে সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে থাকা দলটি অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও বড় ম্যাচের মানসিকতায় এগিয়ে। তাই ইংল্যান্ডের জন্য এটি হবে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ম্যাচের আগে বেলিংহাম বলেছেন, দল হিসেবে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর তার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারাতে হলে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে হবে এবং কোনো মুহূর্তে মনোযোগ হারানো যাবে না। তার বিশ্বাস, ইংল্যান্ড এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। অধিনায়ক হ্যারি কেইনও একই সুরে বলেছেন, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে সাহসী ও ইতিবাচক ফুটবল খেলতে হবে। নকআউট পর্বে দল যেভাবে চাপ সামলেছে, সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। কোচও খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে বলেছেন এবং প্রতিপক্ষের নাম নয়, নিজেদের খেলায় মনোযোগ দিতে জোর দিয়েছেন।
অন্যদিকে ফুটবলপ্রেমীদের চোখ থাকবে আরেকটি লড়াইয়েও বেলিংহাম বনাম মেসি। একদিকে বর্তমান বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা তরুণ, অন্যদিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। একজন নিজের উত্তরাধিকার আরও সমৃদ্ধ করতে চান, অন্যজন ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে চান। ইংল্যান্ডের কোটি সমর্থকের বিশ্বাস, বেলিংহাম যদি তার জাদু আরেকবার দেখাতে পারেন, তবে হয়তো ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসানের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে খ্রি লায়ন্সরা। আর যদি সেটি হয় আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে, তাহলে এই বিশ্বকাপ চির দিনের জন্য বেলিংহামের নামেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সাফল্যের গল্প লিখছেন অনেকেই। তবে সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন বেলিংহাম। মাঝমাঠের এই তারকা যেন একাই বদলে দিচ্ছেন ম্যাচের চিত্র। গোল করছেন, আক্রমণ গড়ছেন, আবার প্রয়োজন মতো রক্ষণেও দিচ্ছেন সমান অবদান। ফলে সেমিফাইনালে ওঠা ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখন বেলিংহাম। টানা দুই নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চই যেন তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। এ প্রসঙ্গে বেলিংহাম বলেন, 'আমি শুধু নিজের কাজটা করার চেষ্টা করছি। দলের জয়ে অবদান রাখতে পারলেই আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান নয়, আমার লক্ষ্য ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জেতানো। যদি আমরা ট্রফি জিততে পারি, সেটাই হবে আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন।'
ইংল্যান্ড কোচের মতে, বেলিংহাম এখন শুধু প্রতিভাবান তরুণ নন, তিনি একজন পরিণত নেতা। টমাস টুখেলে বলেন, 'জুড এমন একজন ফুটবলার, যে কঠিন মুহূর্তে দায়িত্ব নিতে ভয় পায় না। তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, ম্যাচ পড়ার দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস আমাদের দলের জন্য অমূল্য।' ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনের ভাষায়, 'বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন এখন জুড। সে শুধু গোলই করছে না, পুরো দলকে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করছে। ওর মতো খেলোয়াড় থাকলে দলের আত্মবিশ্বাসও অন্য রকম হয়ে যায়।'
সতীর্থ বুকায়ো সাকা বলেন, 'অনুশীলনেও জুড একই রকম ক্ষুধার্ত থাকে। ম্যাচে যা করছে, তা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। ও প্রতিদিন নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করে।' ডিফেন্ডার জন স্টোনসের মতে, 'বেলিংহামের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, সে কখনো চাপ অনুভব করে না। যত বড় ম্যাচ, তত বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলে।'
প্রতিপক্ষরাও বেলিংহামের প্রশাংসায় পঞ্চমুখ। নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেন ম্যাচ শেষে বলেন, 'আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম বেলিংহামকে থামানোর। কিন্তু সে এমন একজন খেলোয়াড়, যাকে ৯০ মিনিট নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব। ছোট্ট একটি সুযোগ পেলেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।' নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও প্রশংসা করে বলেন, 'জুড অসাধারণ খেলেছে। বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হওয়ার পথে সে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।'
মাত্র কয়েকটি ম্যাচেই বেলিংহাম প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি শুধু ভবিষ্যতের তারকা নন, বর্তমানেরও অন্যতম সেরা। মাঝমাঠ থেকে খেলার নিয়ন্ত্রণ, বক্সে ঢুকে গোল করার ক্ষমতা, শারীরিক শক্তি এবং নেতৃত্ব-সবমিলিয়ে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অস্ত্র এখন তরুণ এই মিডফিল্ডার।
সামনে সেমিফাইনালে শক্তিশালী আর্জেন্টিনা। সেখানে আবারও বেলিংহামের জাদু দেখার অপেক্ষায় ইংলিশ সমর্থকেরা। কারণ এই বিশ্বকাপে যখনই দলের প্রয়োজন হয়েছে; তখনই তুরুপের তাস হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন জুড বেলিংহাম।

