শিশু পরিবার থেকে বিদায়ের পর কোথায় যাবে তারা? অনিশ্চয়তায় পাঁচ তরুণ

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৩:০৪

কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এ বেড়ে ওঠা পাঁচ এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন। তবে তাদের কেউ এইচএসসি, কেউ অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকায় অন্তত পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ চেয়েছেন তারা। একই সঙ্গে পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন।

জানা যায়, ভুক্তভোগী পাঁচ শিক্ষার্থী হলেন মো. আকাশ ইসলাম, মো. আকাশ শেখ, মো. তুষার আহাম্মেদ, মো. আলফাজ হোসেন ও মো. অভি হাসান। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে পারিবারিক দারিদ্র্য, স্বজনদের অক্ষমতা কিংবা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের মতো নানা কারণে তারা সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় সেখানে থেকেই তারা পড়াশোনা চালিয়ে আসছেন।

আকাশ ইসলাম বলেন, এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর আত্মীয়স্বজনের কাছে বড় হন। পরে ২০০৭ সালে শিশু পরিবারে ভর্তি হন। ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। এখন প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।

তুষার আহাম্মেদ বলেন, সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। বর্তমানে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নিতে চান। কিন্তু এখন আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আকাশ শেখ জানান, ২০১১ সালে তাকে শিশু পরিবারে ভর্তি করা হয়। তিনি এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯ এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০০ পেয়ে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। আগামী ২৭ জুলাই তার প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। তিনি বলেন, পরীক্ষার ঠিক আগে কোথায় যাব, কীভাবে পড়াশোনা করব-তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

আলফাজ হোসেন জানান, বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক সংকটের কারণে ২০১২ সালে শিশু পরিবারে ভর্তি হন। আর্থিক অভাবে এক বছর কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও বর্তমানে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। তিনি বলেন, আমাকে রাখার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত এখানে থাকতে পারলে পড়াশোনা শেষ করতে পারব।

অভি হাসানও একই ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে তার পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে যায় না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয় হারালে তাদের শিক্ষা ও কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে অন্তত চলমান পড়াশোনা ও পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তারা।

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুল লতিফ বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় তাদের শিশু পরিবার (বালক) ছাড়তে হবে। তবে তারা যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। এছাড়া যেকোনো প্রয়োজনে তারা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহযোগিতা পাবে।

১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর শিশু পরিবার থেকে বের হওয়া এসব তরুণের পুনর্বাসন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। এরপর আমরা চেষ্টা করি তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। এর বাইরে আমাদের করণীয় খুবই সীমিত। তবে এই পাঁচজনের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি এবং কীভাবে তাদের আরও সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছি।

ইত্তেফাক/এএইচপি