একদিকে ডেঙ্গু অন্যদিকে বানভাসি মানুষ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৯

দেশে রোজ অপঘাতে মারা পড়ছে মানুষ। মানুষের জন্য নিরাপদ নয় খাদ্য, ওষুধ, সড়ক, নিরাপদ নয় কর্মস্থলও। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো পরিবারে অকাল মৃত্যুর বিভীষিকা নিয়ে হাজির হয় বিভিন্ন দুর্ঘটনা। প্রায় হাজার মায়ের বুক খালি হয়েছে, পিতা বা মাতাহারা হয়েছে অসহায় সন্তানেরা।

প্রতিদিনই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এবং মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের ৬৪ জেলার সবকটিতেই ছড়িয়ে পড়েছে এই মহামারি। ৩ আগস্ট ২০১৯ পর্যন্ত খবর ছিল: সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের গত সাত মাসে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ ১০ হাজার ৫২৮ জন ডেঙ্গুর ছোবলে পর্যুদস্ত হয়েছেন। গত ১৮ বছরের মধ্যে এই বছরই সবচেয়ে বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা গত ১০ বছরে বেড়েছে ৯ গুণ। বেসরকারি হিসেবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সরকারি রক্ষণশীল হিসেবের চাইতে অনেক বেশি প্রায় সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি। জাতীয় দৈনিকের তথ্যমতে, গত পয়লা আগস্ট ২০১৯ পর্যন্ত মারা গেছেন ৬৯ জন। এর মধ্যে একজন সিভিল সার্জনও রয়েছেন। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ১৪। রাজধানী ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের নিন্দা, সমালোচনায় ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ সোচ্চার। বিষয়টি উচ্চআদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু হায়! সমস্যা যে তিমিরে ছিল রয়ে গেছে সেই তিমিরেই। খুব শিগগিরই পরিত্রাণ মিলবে এমন কোনো ভরসা নেই।

প্রতিদিনই ডেঙ্গুর খবরে সংবাদপত্র ঠাসা। ৪ আগস্ট একটি পত্রিকা বলেছে, প্রতি ঘণ্টায় ৭০ জন আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি যারা ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা স্থগিত রেখেছেন দেশে আসা। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের বাংলাদেশ সফরে আসার ব্যাপারে নিরুত্সাহিত করেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটস সংকট দেখা দিয়েছে। দাম বেড়ে গেছে কীটনাশকসহ মশক নিধনের সাজ-সরঞ্জামের। রাজধানী ঢাকার হাসপাতাল, ক্লিনিকে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা। ডেঙ্গু রোগীতে সব হাসপাতাল, ক্লিনিক ঠাসা। দেশে মশার ওষুধ কবে নাগাদ আসবে, এবং তা মশা দূর করবে তা কারো জানা নেই। সবমিলিয়ে মহা আতঙ্কজনক এক পরিস্থিতি।

ঘাতক ডেঙ্গু বাংলাদেশে যখন ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই সময়ে পড়শি ভারতের কলকাতার পরিস্থিতি কেমন? ডেঙ্গু সমস্যা মোকাবেলায় গত পাঁচ বছর ধরে তারা সাফল্য পাচ্ছে। বছরভর সমন্বিত কার্যকর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা এডিস মশা নিধনে তত্পর থাকছে। সুফলও মিলছে সে কারণে। কলকাতায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম গত ৩ আগস্ট বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় কলকাতার সফল রণকৌশলকে কাজে লাগাবে বাংলাদেশ। উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের ভিডিও কনফারেন্স হয়েছে ৫ আগস্ট। কলকাতার ডেপুটি মেয়র ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তিন স্তরে মনিটরিংয়ের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শীতকাল থেকেই শুরু করতে হবে মশক নিধন কার্যক্রম।

ঈদের ছুটিতে অন্তত ৫ লাখ মানুষ ডেঙ্গুর জীবাণু নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিন ক্যাম্পাস উইক ঘোষণা করা হয়েছে। ৫ আগস্ট এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, পরিষ্কার রাস্তায় ময়লা ফেলে তা পরিষ্কারকরণের মধ্যদিয়ে! বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়  সেই ফটোসেশনে মন্ত্রী, মেয়র, সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। এই ফটোসেশন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে।

৬ আগস্ট আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঢাকা সিটিতে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা মুখে যতই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কথা বলি না কেন, এটা এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এটাই হলো বাস্তবতা। ঢাকা শহরের ১০৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৯টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা মাঠে নামায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের ফটোসেশন করার জন্য এ অভিযান নয়। নেত্রী জানতে চেয়েছেন, কয়টা ওয়ার্ডে তার নির্দেশনা পালিত হয়েছে। ওবায়দুল কাদের বলেন, ভয়ংকর এডিস মশা মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, সাংবাদিক কাউকেই ছাড়বে না।

রাজধানী ঢাকার দুই সিটিতে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহক এডিস মশা নিধনে অকার্যকর ওষুধ ক্রয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে এ মর্মে খবর বেরিয়েছে। বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট একটি সিন্ডিকেট ওষুধ আমদানিকারক সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নিচুমানের অকেজো ওষুধ সরবরাহ করায় এরই মধ্যে আমদানিকারক একটি সংস্থাকে ব্ল্যাক লিস্টেড করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু সেই একই সংস্থা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ওষুধ সাপ্লাই অব্যাহত রেখেছে।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ: ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৮ ও দক্ষিণে ৭৮ শতাংশ এলাকায় এডিস মশার লার্ভা দেখা গেছে। এই তথ্য থেকে এটাই সুস্পষ্ট যে, দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। রাজধানীর মশা যে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে, এ বিষয়ে একবছর আগে দুই সিটি করপোরেশনকে সতর্ক করেছিল আইসিডিডিআরবি। এই সতর্কবার্তার পর দুই করপোরেশন কী কী উদ্যোগ নিয়েছে সেটা একটা জ্বলন্ত প্রশ্ন। ৩০ জুলাই শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ঢাকার দুই মেয়রই ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছেন।

বানভাসি মানুষের দুর্দশা চরমে। দেশের বিপুল সংখ্যক বানভাসি মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকট হয়ে ওঠায় তাদের প্রতি জাতির মনোযোগ যতটা নিবদ্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল, তা হয়ে ওঠেনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের দ্য নিডস অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (এনএডব্লিউজি) একটি হিসেব দিয়েছে। বাংলাদেশের এবারের বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতির স্পষ্ট একটি চিত্র ফুটে উঠেছে তাদের প্রতিবেদনে।

সেই মূল্যায়নের হিসেব অনুসারে বন্যায় কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮টি জেলা। প্রাণহানি ঘটেছে ১১৯ জনের। আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬ লাখ মানুষ। গবাদিপশু ও পোলট্রির ক্ষতি ৭০৪ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭১। পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে ৩৪ হাজার ৭৩১টি বাড়ি। গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৭ হাজার ৩৯১ জন। কিন্তু দায়িত্বশীলদের দায়িত্বের অভাবে রোজ বাড়ছে আমজনতার হাহাকার। যদিও এগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তবে এসব বিপর্যয় রোধে মুক্তি পাওয়ার জন্য একে অপরকে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে হয়তো এ বিপর্যয় থেকে আমরা পরিত্রাণ পাবো। মনোযোগী হতে হবে নিজের উদ্যোগেই।

n লেখক : গবেষক