পে-স্কেল চূড়ান্তে আরও সময় লাগবে, সুপারিশ শেষ করতে আবার বসবে সচিব কমিটি

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩১

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি। বুধবার (১৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠকেও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আগামী সপ্তাহে আবার বৈঠকে বসে সুপারিশমালা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর ধরা হলেও গেজেট প্রকাশে আরও সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে বুধবার অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি নানা দিক পর্যালোচনা করা হয়। অর্থ বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রায় ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রথম ধাপে মূল বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী দুই ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের প্রস্তাবও আলোচনায় আছে।

বৈঠকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাস্তবায়নের ধাপ, সফটওয়্যার কাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে সুপারিশ চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। সচিব কমিটি সরকারের কাছে একটি সুপারিশমালা দেবে, যার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিশনের প্রস্তাবিত ২০টি গ্রেড বহাল থাকবে কি না, নাকি এতে পরিবর্তন আনা হবে, সেটিও আলোচনায় এসেছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ২০তম গ্রেডের বেতন ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা এবং প্রথম গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

কমিটির এক সদস্য বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে এবং কমিটি নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। সুপারিশ জমা পড়ার পর সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। এতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলেও তিনি জানান।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের বদলে কিছু পরিবর্তন আনার চিন্তা চলছে। মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধায় রদবদল করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে শুধু বেসিক বেতন কার্যকর হবে, পরে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হবে।

তবে এই ধাপভিত্তিক বাস্তবায়নে কারিগরি জটিলতাও দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং আইবাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্রাচুইটি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে ধাপে ধাপে নতুন কাঠামো কার্যকর করতে হলে সফটওয়্যারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।

আইএমএফের উদ্বেগ
এদিকে, ১২ জুলাই থেকে ঢাকায় অবস্থান করা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি প্রতিনিধিদল নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তারা বলেছে, চলমান আর্থিক চাপ ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

আইএমএফের মতে, অর্থের সংস্থান নিশ্চিত না করে পুরো বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতিও উসকে যেতে পারে। এ কারণেই সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সচিব কমিটির আলোচনায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে নীতিগতভাবে আগ্রহী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। এছাড়া নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের সুবিধা সমন্বয়ের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।

তবু সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বেতন-ভাতা বাড়ানো এবং অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার সামগ্রিক প্রভাব হিসাব করতে গিয়ে সরকার চাপে রয়েছে। সে কারণেই একাধিক বৈঠক করেও বাস্তবায়ন কৌশল চূড়ান্ত করা যায়নি।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশন সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়।

পরবর্তীতে বর্তমান সরকার পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় বিবেচনায় নতুন করে বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়। সেই লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এখন সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নবম পে-স্কেলের গেজেট চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

ইত্তেফাক/এনএন