মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা

ইয়েমেনের হুতিদের কেন্দ্র করে সৌদি আরব-ইরান লড়াই

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৯

ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা, ইয়েমেনের হুতিদের পালটা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি এবং লোহিতসাগরে নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। ফলে ইয়েমেনকে ঘিরে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঐ অঞ্চলের রাজনীতি ।

সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার শুচনা হয় সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালিয়ে একটি ইরানি বিমানকে অবতরণে বাধা দেয়। সরকারের দাবি, ঐ বিমানের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং এর মাধ্যমে হুতিদের সহায়তা দেওয়া হতে পারে। ইয়েমেনের এই সংকট মূলত সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের একটি অংশ। হুতি বিদ্রোহীদের পেছনে ইরানের সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে সৌদি আরব। অন্যদিকে হুতিরা নিজেদের ইয়েমেনের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে আসছে। হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, তারা যদি আমাদের বিমানবন্দর বন্ধ করতে পারে, তাহলে আমরাও তাদের বিমানবন্দরে হামলা চালানোর অধিকার রাখি। এরপর হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, তারা এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে । হুতিরা জানিয়েছে, সানা বিমানবন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া হলে তারা আরো পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে তেহরান-সানা বিমান যোগাযোগ চালু রাখার কথাও বলেছে তারা।

ইয়েমেনের বর্তমান সংকটের শুরু 2018 সালে। সে সময় হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। সৌদি আরবের অভিযোগ, হুতিরা ইরানের সমর্থনপুষ্ট একটি প্রক্সি বাহিনী। রিয়াদের আশঙ্কা, ইয়েমেনের মতো কৌশলগত অবস্থানে ইরানের প্রভাব বাড়লে তা সৌদি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে । সিএনএনের সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিক ফ্রানকোনা বলেন, সৌদি আরব হুতিদের ইরানের একটি মিত্র বাহিনী হিসেবে দেখে, যেমন দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে ইরানের মিত্র শক্তি হিসেবে দেখা হয়। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান এবং সুন্নি-প্রধান সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে । ইয়েমেন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ২০২২ সালে ইয়েমেনে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে আসে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা এগোয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হোদেইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ বিভিন্ন এলাকায় আবারও সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। হোদেইদার হায়েস এলাকায় হুতি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। লোহিতসাগরের কাছে হওয়ায় এই অঞ্চল সামরিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আল-জাওফে উপজাতীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে হুতিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি হুতিদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ইয়েমেন সংকট শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে । লোহিতসাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ২০২৪ সালে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন হয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন