প্রশ্নপত্র যেভাবে নির্ধারণ করা হয়

এইচএসসি পরীক্ষার পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে যে দুটি ভুল ছিল

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩১

চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের সৃজনশীল অংশের দুই প্রশ্নপত্রে ‘ভুল’ ছিল। প্রশ্ন পর্যালোচনার পাশাপাশি পাঁচ জন পরীক্ষার্থী ও পদার্থবিজ্ঞানের দুই জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৬ নম্বর সৃজনশীলের ‘গ’ এবং ৭ নম্বর সৃজনশীলের ‘গ’ ও ‘ঘ’ উপ-প্রশ্নে ছিল অসংগতি। সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের ২ নম্বর সেটের (যমুনা) ৬ নম্বর উদ্দীপকের প্রশ্ন গ-তে গড় মুক্ত পথ নির্ণয় করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য উদ্দীপকে গড় মুক্ত পথ বের করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এখানে অনুর কার্যকর ব্যাস উল্লেখ করা নেই। একই প্রশ্নপত্রের ৭ নম্বর উদ্দীপকে দুটি ভেক্টরের একটার কোন লব্ধির সঙ্গে ২৫ ডিগ্রি দেওয়া আছে। কিন্তু উদ্দীপকের দুটি ভেক্টরের মধ্যবর্তী কোণ হিসাব করলে ৬.৪১ ডিগ্রি হয়, যা যুক্তিসংগত নয়। দুটি ভেক্টরের মধ্যবর্তী কোণ অবশ্যই ২৫ ডিগ্রি এর চেয়ে বড় হতে হবে এমনভাবে ভেক্টর দুটির তথ্য দেওয়া উচিত ছিল।

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষা ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে। আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৫৯টি জেলায় এই অভিন্ন পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার এক পরীক্ষার্থীর দাবি, ‘সৃজনশীল প্রশ্নের ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর দুটি প্রশ্ন সুনিশ্চিতভাবে ভুল। ৬ নম্বর প্রশ্নে অনুর ব্যাসার্ধ দেওয়া নেই। আপনি মনে করতে পারেন, অনুর ব্যাসার্ধ মুখস্থ বসাব। কিন্তু পৃথিবীর সব অনুর ব্যাসার্ধ সমান না।’ তিনি বলেন, ‘৭ নম্বর প্রশ্নে দুটি ভেক্টর দিয়ে দিয়েছেন। দুটি ভেক্টর দিয়ে দিলে এদের মধ্যবর্তী কোণ নির্দিষ্ট। আপনি এমন দুটি ফ্যাক্ট দিয়েছেন যাদের মধ্যবর্তী কোণ ৬ ডিগ্রি। কিন্তু প্রশ্নে দিয়ে রেখেছেন ২৫ ডিগ্রি।’

পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুলের জন্য শিক্ষার্থীদের ফুল ক্রেডিট দেওয়া হবে ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—তাহলে কি প্রশ্নপত্রে উল্লেখিত ৬ ও ৭ নম্বর উদ্দীপককে ঘিরে তৈরি ৪ প্রশ্নের জন্য মোট ২০ পূর্ণ নম্বরই দেওয়া হবে? নাকি শুধু ভুল থাকা প্রশ্নের ১০ নম্বর?

কয়েক ধাপে হয় যাচাই, তার পরও কেন ভুল প্রশ্নপত্র :প্রতিটি বিষয়ে বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) ও সৃজনশীল—দুই অংশের জন্য পৃথক প্রশ্ন প্রস্তুত করা হয়। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে প্রধান প্রশিক্ষকদের (মাস্টার ট্রেইনার) একটি তালিকা থাকে। সেই তালিকা থেকে নির্ধারিত সময়ের আগে প্রতিটি বিষয়ে চার জন প্রশ্নপ্রণেতা নির্বাচন করা হয়। প্রত্যেকে আলাদাভাবে একটি করে পূর্ণাঙ্গ প্রশ্নপত্র তৈরি করেন এবং সিলগালা খামে তা বোর্ডে জমা দেন। এরপর শুরু হয় মডারেশন বা পরিশোধন প্রক্রিয়া। চার জন অভিজ্ঞ শিক্ষক গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নগুলো যাচাই করেন। তারা প্রয়োজনে প্রশ্ন সংশোধন, সংযোজন, বর্জন কিংবা সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্র তৈরিরও ক্ষমতা রাখেন। যাচাই শেষ হলে চার সেট প্রশ্ন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হয় এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সংরক্ষণ করা হয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জন্য মোট ৩৬ সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়। এরপর বোর্ডের চেয়ারম্যানরা লটারির মাধ্যমে চার সেট নির্বাচন করেন। এর মধ্যে দুটি সেট বিজি প্রেসে ছাপানোর জন্য পাঠানো হয় এবং বাকি দুটি সংরক্ষণে রাখা হয়, যাতে প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। প্রশ্নপত্র ছাপা শেষ হলে সেগুলো স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা পর্যায়ে সাধারণ ট্রেজারি এবং উপজেলা পর্যায়ে সাধারণত থানায় প্রশ্নপত্র নিরাপত্তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষার দিন সকাল ৯টা ১০ মিনিটে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র নির্বাচন করেন। এরপর সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসনকে তা জানানো হয়। ফলে আগে থেকেই কোন প্রশ্নপত্র ব্যবহার হবে, তা জানার সুযোগ থাকে না।

ইত্তেফাক/এএম