‘হিল্লা বিয়ে’ নিয়ে ইসলামি শরিয়তের বিধান কী?

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ১৬:৫৩

আমাদের দেশে ইসলামের অনেক বিধানের বিকৃত প্রচলন ঘটেছে। হিল্লা বিয়ে তেমনই একটি বিষয়। অনেকেই মনে করেন, তিন তালাকের পর স্ত্রীকে অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তালাক করিয়ে আনলেই প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় সংসার করা বৈধ হয়ে যায়।

মূলত তালাকপ্রাপ্ত নারীকে চুক্তিভিত্তিক এক দিনের জন্য অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে রেখে ফের আগের স্বামীর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মানেই হিল্লা বিয়ে। ইসলামে এই পদ্ধতির বিয়েকে সম্পূর্ণ হারাম বলা হয়েছে। (শরহে কানজ: ২ / ১৩৪; ফিকহুস সুন্নাহ: ২ / ৪২-৪৩ পৃ.)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তারা বলেছেন, ‘রাসুল (সা.) হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়কে লানত করেছেন।’ (তিরমিজি: ১১১৯ ও ১১২০; আবু দাউদ: ২০৭৬; ইরওয়াউল গালিল,৬ / ৩০৮-৩০৯)

শুধু তা-ই নয়, অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.)-এর যুগে হিল্লা বিয়েকে ব্যভিচার হিসেবে গণ্য করা হতো।’ 

হজরত ওমর (রা.) হিল্লা সম্পর্কে বলেন, ‘আমার কাছে হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় তাদের পেশ করা হলে আমি তাদের “রজম”, অর্থাৎ প্রস্তরাঘাত করব।’ (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৩৬১৯১; বায়হাকি, আস-সুনান আল-কুবরা: ১৪১৯১; ইগাসাতুল লাহফান, ১ / ৪১১)

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এরপর যদি দ্বিতীয় স্বামীও তাকে তালাক দেয়, তবে তারা উভয়ে পুনরায় মিলিত হতে চাইলে তাদের জন্য কোনো পাপ নেই, যদি তারা মনে করে যে, তারা আল্লাহর বিধান মেনে চলতে পারবে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)

হিল্লা বিয়ের প্রচলন যেভাবে

রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মানুষ ধীরে ধীরে ধর্ম থেকে দূরে সরে আসার কারণে মুসলিম সমাজে তালাকের প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে এর সমাধানের জন্য একশ্রেণির আলেমদের মাধ্যমে হিল্লা বিয়ের মতো কুপ্রথা সমাজে চালু হয়ে পড়ে। এর জন্য সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়। 

আয়াতটি হলো-

‘অতঃপর যদি সে স্ত্রীকে তালাক দেয়, তাহলে ওই স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না। তবে যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে হয় এবং সে তাকে তালাক দেয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে প্রথম স্বামী এবং এই নারী যদি আল্লাহর সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করতে পারবে বলে মনে করে, তাহলে তাদের উভয়ের জন্য পরস্পরের দিকে ফিরে আসায় কোনো ক্ষতি নেই।...’ (সুরা বাকারা: ২৩০)

এ আয়াতের ওপর ভিত্তি করেই মূলত হিল্লা বিয়ের পক্ষে কিছু আলেম রায় প্রদান করলেও পরবর্তী সময়ে প্রায় সব বিজ্ঞ আলেম তাদের প্রচলন করা বিকৃত পদ্ধতির এই ‘হিল্লা বিয়ে’কে নিষিদ্ধ করেছেন এবং এটিকে একটি ভ্রান্ত ও প্রচলিত কুসংস্কার হিসেবে পরিগণিত করেছেন।’ (শরহে কানজ: ২ / ১৩৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ: ২ / ৪২-৪৩ পৃ.)

আয়াতের প্রকৃত ব্যাখ্যা

আয়াতটি কাদের জন্য প্রযোজ্য, তা স্পষ্ট হতে আমাদের পরবর্তী ২৩২ নম্বর আয়াতের দিকে নজর দিতে হবে। সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের তালাক দেওয়ার পর যখন তারা ইদ্দত পূর্ণ করে নেয়, তখন তাদের নিজেদের প্রস্তাবিত স্বামীদের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে তোমরা বাধা দিয়ো না, যখন তারা প্রচলিত পদ্ধতিতে পরস্পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্মত হয়।...’ (সুরা বাকারা-২৩২)।

আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত নারীর ইদ্দত পালনের পর অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করার বৈধতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তখন যেন আগের স্বামী কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি করে তার অধিকার খর্ব না করে। যদি বিয়ের পরে সেই স্বামী ছেড়ে দেয়, তাহলে পূর্বের স্বামী বিয়ে করাতে আপত্তি নেই। এত চমৎকার একটি পদ্ধতির ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে হিল্লার মতো জঘন্য একটি প্রথা সমাজে চালু হওয়া জাতির জন্য এক অশনিসংকেত।

এছাড়া বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘হিল্লা বিয়ে বলে যে বিয়ে প্রচলিত ছিল, সেটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে হিল্লা বিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই আয়াতে কোথাও পরিকল্পিতভাবে অন্য কাউকে বিয়ে করে আবার তালাক দিয়ে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। বরং দ্বিতীয় বিয়েটি হতে হবে স্বাভাবিক ও প্রকৃত দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্যে।

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, “আল্লাহ লানত করেছেন হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়ের ওপর।” (সুনান আবু দাউদ: ২০৭৬, তিরমিজি: ১১২০)

আরেক হাদিসে রাসূল (সা.) হিল্লাকারীকে “ধার করা পাঁঠা” বলে আখ্যায়িত করেন এবং এই প্রথার প্রতি কঠোর নিন্দা জানান।

ইসলামিক গবেষকদের মতে, যদি কোনো নারী তিন তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে সেই বৈবাহিক সম্পর্ক স্বাভাবিক কারণে বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়, তাহলে ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে করা বৈধ হতে পারে। তবে শুরু থেকেই তালাক দেওয়ার শর্তে বা প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা বিয়ে শরিয়তসম্মত নয়।

আলেমরা বলছেন, পরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থাকে অপব্যবহারের শামিল এবং এটি একটি গর্হিত কাজ। তাই কুরআন ও হাদিসের আলোকে এমন বিয়ে থেকে মুসলমানদের বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

উত্তর দিয়েছেন:মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, পরিচালক, তালিমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা

ইত্তেফাক/এনটিএম