সাইবার হা’মলায় লন্ডন অচল করার দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণসহ ২ জনের জেল

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১১:২৯

লন্ডনের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের (টিএফএল) ওপর হওয়া ভয়াবহ সাইবার হামলায় সংস্থাটির প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড ক্ষয়ক্ষতি হয়। ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ গ্যাংয়ের দুই তরুণ এই হ্যাকটি পরিচালনা করেছিল, যার ফলে টিএফএলকে তাদের অনলাইন ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে হয় এবং সকল কর্মীকে অফিসে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে পাসওয়ার্ড রিসেট করতে হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) প্রায় দুই বছর পর সেই হামলার দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি থালহা জুবায়ের (২০) ও তার ব্রিটিশ সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্সকে (১৮) সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের উলউইচ ক্রাউন কোর্ট।

রায়ে বিচারক মার্ক টার্নার বলেন, ‘এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত কোনো অন্তর্ঘাত ছিল না। আন্তর্জাতিক হ্যাকার গোষ্ঠী ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালিয়েছিল। এ হামলা ছিল একধরনের বেপরোয়া বাহাদুরি। আসামিরা লাখো মানুষের দুর্ভোগের কথা উপেক্ষা করেই এ হামলা চালিয়েছিলেন।’

কম্পিউটার মিসইউজ আইনের ৩ জেডএ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোয় এ ধরনের হামলার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে আসামিদের বয়স, নিউরোডাইভারজেন্ট (মস্তিষ্কের বিকাশ বা কাজ করার ধরন সাধারণ মানুষের তুলনায় ভিন্ন) অবস্থা, বিশেষ করে জুবায়েরের অটিজম ও ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাড়ে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছেন আদালত। বিচার চলাকালে উভয়ে দোষ স্বীকার করায় তারা সাজার ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছেন।

যেভাবে অচল হয়ে পড়েছিল টিএফএল

২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা কয়েক দিন টিএফএলের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করেছিল হ্যাকার চক্র। তদন্তকারীদের ভাষ্য, হামলার এক পর্যায়ে হ্যাকাররা পুরো সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আরও বড় বিপর্যয় ঠেকাতে টিএফএল পুরো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়। এর ফলে প্রায় ২৮ হাজার কর্মীকে অফিসে গিয়ে নতুন করে পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা পরিচয়পত্র ‘রিসেট’ করতে হয়। ব্যাহত হয় বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম।

তদন্তে জানা যায়, হামলার সময় ওয়েন ফ্লাওয়ার্স পুরো হ্যাকিং কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করেন। আর জুবায়ের তা তাঁর বন্ধুদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেন। লন্ডনের পরিবহনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নিয়ে তিনি দম্ভোক্তি করেন।

অপরাধের পুরোনো রেকর্ড

যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে মা–বাবার সঙ্গে থাকছিলেন জুবায়ের। তাঁর বাবা একজন কেয়ারকর্মী। মা ছেলের দেখাশোনার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

জুবায়েরের বিরুদ্ধে কিশোর বয়স থেকেই অনলাইন প্রতারণাসহ কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট অপরাধে সংশ্লিষ্টতার একাধিক রেকর্ড ছিল। ডার্ক ওয়েবে ছদ্মনামে তিনি আন্তর্জাতিক হ্যাকার মহলে পরিচিত ছিলেন।

অন্যদিকে ফ্লাওয়ার্স যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ওয়ালসালে নানি ও মামার সঙ্গে বসবাস করতেন। তিনি আগেই পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।

একটি ডিজিটাল সূত্রে চক্র উন্মোচন

সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীদের ভাষ্য, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ফেললে শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ ডিজিটাল সূত্রই হ্যাকারদের ধরিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রেও একই রকমের ঘটনা ঘটেছে।

তদন্তকারীরা বলেছেন, জুবায়েরের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ব্যবহার করে গিফট কার্ড ও একটি অনলাইন গেমিং অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল। এসব লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা তাঁর অনলাইন পরিচয়, সার্ভার অবকাঠামো ও পূর্ব লন্ডনের বাসার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন।

পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে জুবায়েরের বাসা থেকে একটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট উদ্ধার করেছিল, যা আগে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে আরও বড় বিচারের মুখে

যুক্তরাজ্যে সাজা ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ মামলার একটি অধ্যায় শেষ হলো। কিন্তু জুবায়েরের সামনে আরও বড় আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্রে।

মার্কিন বিচার বিভাগ জুবায়েরের বিরুদ্ধে পৃথক ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে ১২০টির বেশি সাইবার হামলা চালিয়ে তাঁর চক্র ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ আদায় করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে ২০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে।

যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জুবায়েরের যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জুবায়েরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর দীর্ঘ কারাদণ্ড হতে পারে।

বড় সতর্কবার্তা

যুক্তরজ্যের সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটি শুধু দুই তরুণের অপরাধের বিচারের বিষয় নয়; বরং তা আধুনিক রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও। টিএফএলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সাইবার হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েকজন দক্ষ হ্যাকার চাইলে দূরে বসেই একটি শহরের জনজীবনকে অচল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে মামলাটি প্রমাণ করেছে, ডিজিটাল জগতে অপরাধ যতই জটিল হোক, শেষ পর্যন্ত সেই প্রযুক্তিই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হতে পারে।

ইত্তেফাক/এসএইচ