দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে ইমামতি, জুমার খুতবা, দ্বীনি শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এলাকার মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী। বয়সের ভারে এবার স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে অবসর নিলেন তিনি। বিদায়ের মুহূর্তে প্রিয় ইমামকে ফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সম্মান জানান মুসল্লি ও এলাকাবাসী। আবেগঘন সেই আয়োজনে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন গ্রামের মানুষ।
৯৫ বছর বয়সী মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের মধ্যম শিলুয়া চৌধুরী বাড়ি রৌশআরা বেগম চৌধুরানী জামে মসজিদে টানা প্রায় ৫০ বছর ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) জুমার নামাজের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বিদায় দেওয়া হয়।
মাওলানা শামসুল হক মিয়াজীর বাড়ি উপজেলার মধ্যম শিলুয়া গ্রামে। তিনি মিয়াজি বাড়ির মরহুম এবাদুল্লাহ মিয়াজী মোল্লার ছেলে। ১৯৭৬ সাল থেকে টানা ৫০ বছর ধরে তার বাড়ির পাশে শিলুয়া চৌধুরী বাড়ি রৌশআরা বেগম চৌধুরানী জামে মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তার সম্মানে বিশেষ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসী।
এর আগে খতিব সামছুল হক মিয়াজির বাবা এবাদুল্লাহ মিয়াজি ৮১ বছর এবং তার দাদা হামিদ উল্যাহ মিয়াজি ৬০ বছর এই মসজিদে খতিব ও ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে তাকে মধ্যম শিলুয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। গাড়িটির পেছনে ছিল শতাধিক মোটরসাইকেলের বহর। পথজুড়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রবীণরা সালাম, শুভেচ্ছা ও দোয়ার মাধ্যমে প্রিয় ইমামকে বিদায় জানান। এ সময় অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু।
অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিনের দ্বীনি খেদমতের স্বীকৃতিস্বরূপ মাওলানা শামসুল হক মিয়াজীকে নগদ তিন লাখ টাকা এবং বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এছাড়া ঘোষণা দেওয়া হয় আগামী এক বছরের বেতন, আজীবন পেনশন ও আমৃত্যু যাবতীয় চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে চৌধুরী বাড়ি।
চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী আলমগীর ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান চৌধুরী বলেন, ইমাম সাহেব আমাদের কাছে শুধু একজন ইমাম নন, তিনি ছিলেন অভিভাবক। পাঁচ দশক ধরে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এ সম্মানজনক বিদায়ের আয়োজন করা হয়েছে।
বিদায়ের আগে আবেগঘন কণ্ঠে মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী বলেন, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় এ মসজিদ ও এলাকার মানুষের সঙ্গে কেটেছে। সারা জীবন আল্লাহর দ্বীনের খেদমত করার চেষ্টা করেছি। আমার বাবা ও দাদাও এ মসজিদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার বাবার নির্দেশে এক মসজিদেই জীবন পার করেছি। দায়িত্বের কারণে নিজের অনেক শখ-আহ্লাদ কুরবান দিয়েছি। আজ বিদায় বেলায় মানুষের এত ভালোবাসা ও সম্মান পেয়ে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

