আগেই নষ্ট হয়েছে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। যারা কোয়ার্টারে থাকেন, তারা পানি পান না। ১৫০ বাংলো ও ৭০০ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কোয়ার্টারে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আটটি গভীর নলকূপ এবং ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন আটটি ওভারহেড পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল। ৪০ বছর আগে এই ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এখন নষ্ট হচ্ছে পানির ট্যাংক, মোটর, পাইপসহ রেলওয়ের মূল্যবান সরঞ্জাম।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। তবে এই সম্পদ সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি রেলওয়ের কর্মীরা যারা এখন সেখানে থাকছেন, তাদের জন্যও নেই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭০ সালে দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা স্থাপিত হওয়ার পর কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের আবাসন নিশ্চিতে নির্মাণ করা হয় ২ হাজার ৬৭০টি স্টাফ কোয়ার্টার। এগুলোর মধ্যে ১৫০টি বাংলো ও ৭০০টি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কোয়ার্টারে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য শহরের ইসলামবাগ শেরু হোটেল মোড়, চিনি মসজিদ, গোলাহাট, পুরাতন বাবুপাড়া, সাহেবপাড়া ও মিস্ত্রিপাড়ায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আটটি গভীর নলকূপ এবং ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন আটটি ওভারহেড পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল। রেলওয়ের সেতু, বিদ্যুত্ ও কার্য প্রকৌশল বিভাগ যৌথভাবে এই পানি সরবরাহের কাজটি সমন্বয় করে। কিন্তু ৪০ বছর আগে এই ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, রেলওয়ে স্টেশনসহ স্থানীয় রেলের বিভিন্ন দপ্তরে ৩ হাজার ৮৩২ জনবলের বিপরীতে কর্মরত আছেন প্রায় ৮৭০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের মধ্যে অধিকাংশই পরিবার নিয়ে সেখানে থাকেন। তারা যেসব বাসায় থাকেন, সেগুলোতেও নেই কোনো পানি সরবরাহ। প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে পানির ব্যবস্থা করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাম্পহাউজগুলো জরাজীর্ণ। সেগুলোতে জন্মেছে বড় বড় আগাছা ও পরগাছা। দীর্ঘদিন কোনো ব্যবহার ও সংস্কার না থাকায় বিশালাকার লোহার ওভারহেড পানির ট্যাংক এবং ভূগর্ভস্থ সরবরাহ পাইপগুলোতে মরিচা ধরে ক্ষয়ে গেছে। অনেক জায়গায় মূল্যবান কলকবজা ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। পাম্প হাউজসহ চারপাশের মূল্যবান রেলভূমি স্থানীয় প্রভাবশালী ও অবৈধ দখলদারেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় কারখানার শ্রমিক ও রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারগুলোকে বছরের পর বছর পানির জন্য চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শহরের ইসলামবাগ এলাকায় রেলওয়ের কোয়ার্টারে বসবাসকারী রেলকর্মচারী আতিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনের রান্নাবান্না ও গোসলের জন্য তাদের দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে নিজস্ব খরচে টিউবওয়েল বসাতে হয়েছে। অথচ বেতন থেকে পানির বিলসহ বাসা ভাড়া কেটে নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের বাংলোতে বসবাসকারী এক ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী জানান, কোয়ার্টারগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। প্রতি মাসে কোয়ার্টারের বিপরীতে নানা সুযোগ-সুবিধার কথা থাকলেও মৌলিক এই চাহিদার বিষয়টি রেলওয়ে প্রশাসন বরাবরই এড়িয়ে গেছে।
এ নিয়ে কথা হয় রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, খোলা আকাশের নিচে ফেলে রেখে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করা হচ্ছে। রেলওয়ের এই বিশাল রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা, অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রেলভূমি উদ্ধার এবং কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে অতি দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
রেলওয়ের পানির পাম্পগুলো বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুত্) চন্দন কুমার সরকার বলেন, তীব্র জনবলসংকটের কারণেই মূলত পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না।

