নতুন আবেদন নেই,  সরকারি গেজেটে জুলাই শহীদের সংখ্যা ৮৪৩

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৬:১৮

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কত মানুষ শহীদ হয়েছেন দুই বছর পরও এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি। সরকার, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের দেওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে অমিল।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া আন্দোলন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের মুখে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৮৩৪ জনের প্রথম তালিকা প্রকাশ করে। পরে জুনে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হলে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪।

তবে আগস্টে তালিকা থেকে আটজনের নাম বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে চারজনের নাম দ্বৈতভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বাকি চারজন সরাসরি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এতে সরকারি গেজেট অনুযায়ী শহীদের সংখ্যা নেমে আসে ৮৩৬-এ।

জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্তকরণ, আহতদের চিকিৎসা এবং পরিবারকে সহায়তার জন্য গঠন করা হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে গেজেট থেকে একজন এবং ফেব্রুয়ারিতে আরও তিনজনের নাম বাদ দেওয়া হয়।

পরে এপ্রিলে নতুন করে ১২ জনের নাম শহীদের তালিকায় যুক্ত করা হয়। তবে ১৩ মে আরও একজনের নাম বাদ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে সরকারি গেজেট অনুযায়ী জুলাই শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। আহতের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত ৮৫৬ জনের নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। যাচাই-বাছাইয়ে কয়েকজনের নাম বাদ পড়েছে। যেসব গেজেট থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেখানে নতুন করে আর কোনো নাম যুক্ত হবে না। নতুন কোনো আবেদনও না থাকায় শহীদের সংখ্যা এখন ৮৪৩-এই রয়েছে।

জুলাই শহীদ কারা

সরকারি সংজ্ঞা অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সে সময়ের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের জুলাই শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শহীদদের নাম প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হলেও সময়ে সময়ে তালিকায় নাম যুক্ত ও বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনেকের স্বজন এখনো নিখোঁজ থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জুলাই শহীদদের তালিকা এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দ্রোহযাত্রার নেতৃত্বদানকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শহীদের চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে জাতিসংঘের তথ্য যাচাই করেও একটি নির্ভুল সংখ্যা প্রকাশ করা উচিত। তাঁর মতে, ক্ষতিপূরণ, জনঅর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং ইতিহাসের স্বার্থে বিভ্রান্তি দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।

শহীদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে আসছেন। কেউ দেড় হাজার, কেউ দুই হাজার, আবার কেউ হাজার হাজার মানুষের শহীদ হওয়ার দাবি করছেন।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিভিন্ন ভাষণে কখনো এক হাজার, কখনো দেড় হাজার, আবার কখনো হাজার হাজার শহীদের কথা উল্লেখ করেছেন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন 

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুটি সংখ্যা হলো ১ হাজার ৪০০ এবং ২ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০০ সংখ্যাটি জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনের বরাতে বিভিন্ন সময় উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হতাহতদের জন্য গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। এটি সরকার অনুমোদিত অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবা ও জনকল্যাণমূলক বেসরকারি সংস্থা। ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটের হোম পেজে শহীদের সর্বশেষ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৮২০ জনের বেশি। আর ওয়েবসাইটে শহীদের যে তালিকা রয়েছে, সেখানে রয়েছে ৮৩৫ জনের নাম। 

ইত্তেফাক/এসজে