দুর্ভোগে গোমতীর দুই পাড়ের ২৪ গ্রামের মানুষ

সময় ও ব্যয় বাড়ে, শেষ হয় না সেতুর কাজ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩১

কুমিল্লার তিতাসে আসমানিয়া বাজার সংলগ্ন গোমতী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটি তিন দফায় সময় ও অতিরিক্ত ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি (রিভাইস) হলেও তিন বছরে শেষ হয়নি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু প্রকল্পের নির্মাণ কাজ। এরই মধ্যে দীর্ঘসূত্রতা, নির্মাণে অনিয়ম এবং সংযোগ সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশাবহির্ভূত কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গোমতী নদীর দুই পাড়ের ২৪ গ্রামের কয়েক লাখ মানুষকে।

ইতিমধ্যে সেতুটি তিন দফায় সময় বাড়িয়েও সময়মত নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে নদীর দুই পাড়ের তিতাস উপজেলার পাঁচটি, মুরাদনগরের একটি ও দাউদকান্দি উপজেলার দুইটি ইউনিয়নের প্রায় ৪৫টি গ্রামের প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ । বিশেষ করে আসমানিয়া বাজারের ব্যবসায়ী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এই এলাকার মানুষ বাধ্য হয়ে বিকল্প পথে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে ও নৌকা দিয়ে যাতায়াত করছেন। জরুরি প্রয়োজনে, বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও শিক্ষার্থীরা পড়েছে সবচেয়ে বিপাকে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও  সেতুটির  নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এলাকার মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি উপজেলার রায়পুর বাস স্টেশন থেকে তিতাসের বাতাকান্দি বাজার পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। উক্ত সড়কের আসমানিয়া বাজার সংলগ্ন গোমতী নদীর ওপর আগের (বেইলি) সেতুর স্থানে ১০ কোটি ৭৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৯৯ টাকা ব্যয়ে ৭৫ মিটার নতুন সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট উক্ত কাজ শুরু হয়েছে যার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। এই সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম দফায় ঐ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে তা দ্বিতীয় দফায় বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। ঐ সময়ও কাজ শেষ না হওয়া তৃতীয় দফায় চলতি বছরের ৩০ জুন করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জুন কাজটি সমাপ্তি না হওয়ায় আরও সময় বর্ধিত করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে সেতু নির্মাণের প্রাক্কলিত মূল্য ৯ কোটি ৮০ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৭ টাকা থাকলেও চুক্তি মূল্য হয় ১০ কোটি ৭৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৯৯ টাকা, পরবর্তীকালে ২০২৬ সালের মে মাসে সংশোধিত মূল্য হয় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২ টাকা, বর্তমানে সেতু নির্মাণ খরচ চুক্তিমূল্য ১২ কোটি ১২ লাখ ১৭ হাজার ৯৪২ টাকা। যার মধ্যে সংশোধিত চুক্তিতে ২৮০ মিটার সংযোগ সড়ক ও ২৪০ মিটার রিটার্নিং ওয়াল রয়েছে। এদিকে রিভাইসের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও নির্মাণকাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর অভিযোগ।

আসমানিয়া বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী ও পথচারী বলেন, সড়কটি নকশা অনুযায়ী সোজা হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার ইচ্ছেমতো একাধিক বিপজ্জনক বাঁক তৈরি করেছেন। এতে যানবাহন চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। যা রাতের বেলায় ও বর্ষার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন অভিযোগের দাবিতে সংযোগ সড়ক নির্মাণে অনিয়ম ধরা পড়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এক পর্যায়ে নির্মাণ বন্ধ করে দেন। পরে নকশা অনুযায়ী সংশোধনের নির্দেশ দিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করা হয়। সচেতন নাগরিকদের মতে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু উভয় পাশে নিরাপদ ও মানসম্মত সংযোগ সড়ক না পায়, তাহলে পুরো প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। তাই প্রকল্পের সব অনিয়ম তদন্ত করে দ্রুত কাজ শেষ করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এসএবিএনএমই এর সাইট ঠিকাদার ইঞ্জি. আসাদুল হক জানান আমাদের গত জুন মাসে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আশা করি আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারব, নানা প্রতিরোধের কারণে সেতুর কাজ দেরি হয়েছে। এখন স্থানীয় লোকজনের কারণে সংযোগ সড়ক করতে সমস্যা হচ্ছে। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করছি। তবে শ্রমিকরা একটি বেইস ভুল করায় এসও সাহেবের নির্দেশে তা সংশোধন করে ঢালাইয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। 

উপজেলা প্রকৌশলী মো. খোয়াজুর রহমান জানান, চতুর্থদফা সময় বাড়িতে তা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। সেতুর প্রায় ৭৩ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। রিভাইস অনুমোদন দেরি হওয়ায় ও স্থানীয় কিছু সমস্যার কারণে সেতু নির্মাণে দেরি হচ্ছে। আশা করি, বর্ধিত সময়ের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ পুরোপুরিভাবে শেষ হবে।

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন