মিরপুরে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০৭

জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবনটি নির্মাণের প্রায় নয় বছর পরও চালু হয়নি। একদিনের জন্যও সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় এটি মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে, আর দিনের বেলায় সেখানে বিচরণ করে গবাদিপশু।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের জনবহুল কেন্দ্র থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নির্জন স্থানে নির্মিত ভবনটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। চারপাশ আগাছায় ভরে গেছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের দরজা-জানালার বিভিন্ন অংশ চুরি হয়েছে, ছাদের টালি খসে পড়ছে এবং দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। ফলে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বারী টুটুল ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় এলাকা বাদ দিয়ে নিজের গ্রামের পাশেই ভবনটির স্থান নির্ধারণ করেন। তাদের দাবি, স্থানীয়দের কাছ থেকে চাঁদা তুলে জমি কেনা হয় এবং প্রভাব খাটিয়ে সেখানে প্রকল্পের অনুমোদন নেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পুরোনো ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এলাকাবাসীর দাবি, পুরোনো ভবন সংস্কার করেই দীর্ঘদিন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। পরিবর্তে দুর্গম ও নিরাপত্তাহীন স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ করায় সেটি আর ব্যবহার করা যায়নি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজ ৯৭ লাখ ২৭ হাজার ১৩৮ টাকা ব্যয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে।

তবে নির্মাণ শেষে ভবনটি বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানান তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে সাবেক চেয়ারম্যান) মশিউর রহমান মিলন। তার অভিযোগ, ভবন নির্মাণে নানা ত্রুটি ছিল এবং অবস্থানও নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। পরবর্তীতে দায়িত্বে আসা চেয়ারম্যানরাও একই কারণে ভবনটি চালু করেননি।

সাবেক চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মিলন বলেন, নিজের সুবিধার জন্য সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারী টুটুল নিজ এলাকার পাশে ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া নির্মাণকাজেও বিভিন্ন ত্রুটি ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি ভবনটি বুঝে নেননি। তার ভাষ্য, নির্জন ও সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকায় জনগণের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় ভবনটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পুরোনো ভবন সংস্কার করেই পরিষদের কার্যক্রম চালানো যেত।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্তমানে ভবনটি কোনো সরকারি কাজে ব্যবহার না হলেও রাতের বেলায় সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে এবং বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। দিনের বেলায় ভবনের ভেতর ও আশপাশে গরু-ছাগল অবাধে বিচরণ করে।

অন্যদিকে, নতুন ভবনটি অচল থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের সব কার্যক্রম এখনো পুরোনো জরাজীর্ণ ভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। যে ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই ভবনেই প্রতিদিন নাগরিক সেবা নিতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের মতে, পুরোনো ভবনটি ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় সেখানে যাতায়াতও সহজ।

এ বিষয়ে এলজিইডির মিরপুরের সদ্য সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসান বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে, ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে নয়। তবে ওই এলাকায় নিরাপত্তাজনিত সমস্যা রয়েছে, সেটি সত্য। কেন ভবনটি এত বছর ব্যবহার করা হয়নি এবং সে সময় বিষয়গুলো কেন বিবেচনায় আনা হয়নি, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দীর্ঘ নয় বছর ধরে অচল পড়ে থাকা ভবনটি দ্রুত চালু করা অথবা জনস্বার্থে অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এতে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে, তেমনি ভবনটি অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রেও পরিণত হবে না।

 
ইত্তেফাক/এসএ