অবৈধ তামাক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সিগারেটের আমদানি শুল্ক ৫০ শতাংশ কমিয়েছে মালদ্বীপ সরকার। প্রতি প্যাকেট সিগারেটের আমদানি শুল্ক ৮ মালদ্বীপীয় রুফিয়া (প্রায় ৬৪ টাকা) থেকে কমিয়ে ৪ রুফিয়া (প্রায় ৩২ টাকা) করা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (দব্লিউএইচও)-এর সঙ্গে আলোচনার পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য, উচ্চ করের কারণে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া অবৈধ তামাক বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ মালদ্বীপ সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়ার্ল্ড নো টোব্যাকো ডে অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিল। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশটি সেই নীতিতে পরিবর্তন আনল। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, উচ্চ কর প্রত্যাশিত ফল না দিয়ে বরং অবৈধ সিগারেট ও বিকল্প তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়।
মালদ্বীপের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মুসা জামির দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, সিগারেটের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে বৈধ পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু এতে ধূমপান কমার পরিবর্তে অনেক ভোক্তা অবৈধ সিগারেট ও অন্যান্য বিকল্প তামাকজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর ফলে যেমন অবৈধ বাজারের বিস্তার ঘটে, তেমনি বৈধ সিগারেট বিক্রি থেকে সরকারের রাজস্বও কমে যায়। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে ভোক্তারা আবার নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ পণ্যের দিকে ফিরে আসে এবং অবৈধ বাজারের বিস্তার কমে।
ভৌগোলিকভাবে ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও মালদ্বীপে অবৈধ তামাক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেছে সরকার। ছোট এলাকা হওয়া স্বত্বেও হলেও উচ্চ কর আরোপের পরও অবৈধ সিগারেটের প্রবেশ ঠেকানো যায়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বৈধ ও অবৈধ সিগারেটের দামের ব্যবধান কমিয়ে আনলে অবৈধ পণ্যের আকর্ষণ কমবে, বৈধ বিক্রি বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র কর বৃদ্ধি করলেই অবৈধ তামাক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভারসাম্যপূর্ণ করনীতি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা মালদ্বীপের জন্য নতুন নয়। ভুটান একসময় বিশ্বের অন্যতম কঠোর তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি অনুসরণ করেছিল এবং দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে কার্যত সিগারেট নিষিদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু ব্যাপক চোরাচালান ও অবৈধ বাজারের বিস্তারের কারণে দেশটি পরে সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে। ভুটানের অভিজ্ঞতা দেখায়, বৈধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে অনেক সময় অবৈধ বাজার আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, বিশ্বের সর্বোচ্চ তামাক কর আরোপকারী দেশগুলোর একটি অস্ট্রেলিয়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবৈধ তামাক বাণিজ্যের ফলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ সিগারেটের বাজারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র, অবৈধ সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং তামাক বিক্রেতাদের ওপর একাধিক সহিংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে সরকার বিপুল পরিমাণ আবগারি রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নিয়মিত অবৈধ সিগারেট জব্দ করছে।
ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও মালদ্বীপ অবৈধ তামাক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সফল হয়নি। মাত্র ৫ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজধানী মালে কেন্দ্রিক এই দেশেও উচ্চ কর আরোপের পরও অবৈধ সিগারেটের প্রবেশ ঠেকানো যায়নি। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে বৈধ সিগারেট বিক্রি ও রাজস্ব আদায় কমেছে, কিন্তু ধূমপানের প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। একই ধরনের পরিস্থিতির কারণে ভুটান এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকা সিগারেট নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে আসে। অন্যদিকে, বিশ্বের সর্বোচ্চ তামাক কর আরোপকারী দেশগুলোর একটি অস্ট্রেলিয়াও এখনও অবৈধ তামাক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও রাজস্ব ক্ষতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
মালদ্বীপ সরকার বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে এ ধরনের কোনো সুপারিশ দেওয়ার বিষয়টি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি সংস্থাটি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান নীতি তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তামাকজাত পণ্যের ওপর কর আরোপের পাশাপাশি অবৈধ তামাক বাণিজ্য দমনে আইন প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, সরকারি রাজস্ব এবং অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল অনুসরণ করছে বাংলাদেশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান নীতি তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সরকার একদিকে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর আরোপ করছে, অন্যদিকে অবৈধ তামাক বাণিজ্য দমনে আইন প্রয়োগেও গুরুত্ব দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য, রাজস্ব এবং অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন নীতিনির্ধারণের বড় চ্যালেঞ্জ।

