ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না এবং কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শও আমাকে পরিচালিত করেনি। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো পর্যায়েই আমি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমার পুরো সময় কেটেছে পড়াশোনা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী কাজের মধ্য দিয়ে। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কখনোই মনে হয়নি যে, রাজনীতি করা আমার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে এটাও বিশ্বাস করি, প্রযুক্তি ব্যবসার পাশাপাশি যারা জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন, তারা নিশ্চয়ই সেই ক্ষেত্রেও দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন।
প্রায় ছয় মাস বেসিস-এর পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই সময়েও আমার অবস্থান ছিল স্পষ্ট, যে সিদ্ধান্ত আইসিটি শিল্প ও সদস্যদের জন্য ইতিবাচক মনে হয়েছে, তা সমর্থন করেছি; আর যে সিদ্ধান্ত এই খাতের জন্য ক্ষতিকর মনে হয়েছে, তার বিরোধিতা করেছি কোনো দ্বিধা ছাড়াই। একজন পরিচালক হিসেবে আমার কাজের মূল্যায়ন সদস্যরাই করবেন। আমার কাছে ব্যক্তি বা দল নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিল্পের অগ্রগতি এবং এই ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থই সর্বাগ্রে।
বেসিস প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন
আমি সব সময় বেসিস-কে একটি অরাজনৈতিক, পেশাদার এবং উদ্যোক্তাদের সংগঠন হিসেবেই দেখেছি। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্বপ্নদ্রষ্টারা সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাতে বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইসিটি শিল্প বিকশিত হয়, উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে এবং একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠে। সেই কারণেই বেসিস-এর পরিচয় একটি মেধাভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠন, কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়।
সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই রাজনীতি নয়
একটি ব্যবসায়ী সংগঠন হিসেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা অপরিহার্য। নীতিমালা প্রণয়ন, কর-সংক্রান্ত বিষয়, ক্যাশ ইনসেনটিভ, রপ্তানি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইসিটি শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। তাই সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং সদস্যদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শিল্পের উন্নয়নের জন্য একটি পেশাগত প্রয়োজন।
পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব
বেসিস পরিচালকদের ভূমিকা কেবল বোর্ড সভায় অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সদস্যসেবা নিশ্চিত করা, নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা, শিল্পের স্বার্থ রক্ষা, ইনসেনটিভ ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা, দেশি-বিদেশি এক্সপো ও ট্রেড মিশনে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরি, এসবই পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বেসিস-এর প্রকৃত শক্তি
বর্তমানে বেসিস-এর প্রায় ৩,০০০ সদস্যপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১০,০০০ তরুণ উদ্যোক্তা এবং ৩ লক্ষেরও বেশি দক্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তারা প্রতিদিন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও আইটি সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এই কমিউনিটির অধিকাংশই প্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবী। তাই নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা এবং কার্যকর নেতৃত্বের সক্ষমতাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেন।
দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বার্থ নয়
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেসিস-এর পরিচালনা পর্ষদে ৫০ জনেরও বেশি পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার বিশ্বাস, তাঁদের অধিকাংশই ব্যক্তিস্বার্থে নয়; বরং সংগঠন, শিল্প এবং সদস্যদের জন্য কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আমার কাছেও পরিচালকের পদ কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় বা সুবিধা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি সদস্যদের বিশ্বাসের প্রতিফলন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
গত দুই বছরের শিক্ষা
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তে প্রশাসক ও সহায়ক কমিটির মাধ্যমে একটি সদস্যভিত্তিক সংগঠনকে দীর্ঘ সময় পরিচালনা করা কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সহায়ক কমিটির সদস্যরাও নিশ্চয়ই এই বাস্তবতা সবচেয়ে কাছ থেকে উপলব্ধি করেছেন। অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট প্রয়োজন হয়। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, বেসিস-এর মতো একটি সদস্যভিত্তিক সংগঠনের জন্য নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
নির্বাচনই টেকসই সমাধান
সরকার নিযুক্ত প্রশাসকের ভূমিকা কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনকে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা করা নয়। তাঁদের মূল দায়িত্ব হলো সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের কাছে হস্তান্তর করা। যারা এই সময়ে বিভিন্ন সহায়ক কমিটিতে কাজ করেছেন, তারাও নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন যে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া বেসিস তার পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারে না।
তাই যাঁদের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা ও পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিন। নিজেদের ভিশন ও কর্মপরিকল্পনা সদস্যদের সামনে তুলে ধরুন। সদস্যরা যদি আপনাকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে তারাই আপনাকে তাঁদের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করবেন।
বেসিস আমাদের সবার প্রাণের সংগঠন। এখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, নির্বাচনও হবে, এটাই গণতান্ত্রিক চর্চার সৌন্দর্য। কিন্তু আমাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটাই, বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইসিটি শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
আমি বিশ্বাস করি, একটি অরাজনৈতিক, পেশাদার, সদস্যকেন্দ্রিক এবং সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে পরিচালিত বেসিস-ই সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। এই ঐতিহ্য, এই সংস্কৃতি এবং এই গণতান্ত্রিক চর্চা রক্ষা করা আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, ডিভাইন আইটি লিমিটেড।

