গোলের বন্যায় রাঙানো বিশ্বকাপ

মোট গোলের হিসেবে ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ এখন ইতিহাসের শীর্ষে । তবে ম্যাচপ্রতি গোলের গড়ে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপ । মাত্র ২৬ ম্যাচে ১৪০ গোল, অবিশ্বাস্য ৫.৩৮ গোলের গড় । যে উচ্চতা আজও ইতিহাস হয়ে আছে । এরপর সর্বোচ্চ গোলগড়ের তালিকায় রয়েছে ১৯৩৮ (৪.৬৭), ১৯৫৮ (৩.৬০), ১৯৭০ (২.৯৭) এবং ২০২৬ (২.৯৬)। অর্থাৎ ১৯৭০ সালের পর এত প্রাণবন্ত, এত গোলসমৃদ্ধ বিশ্বকাপ আর দেখা যায়নি । গ্রুপ পর্বের গোলগড়েও ২০২৬ আসরকে ছাড়িয়ে আছে কেবল ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ।

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৯

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি টুর্নামেন্ট ছিল না; ছিল গোলের ভাষায় লেখা এক অনন্য মহাকাব্য। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মাটিতে প্রথমবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে এমন এক পরিসংখ্যান রেখে, যা ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উদ্বোধনী ম্যাচ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ১০৪টি ম্যাচ হয়েছে। ম্যাচগুলোতে গোল হয়েছে ৩০৮টি। ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ২.৯৬। সংখ্যাটি নিছক রেকর্ড নয়; এটি আধুনিক ফুটবলের বদলে যাওয়া দর্শনের উজ্জ্বল রূপরেখা।

গ্রুপ পর্বে ৭২ ম্যাচে হয়েছে ২১৫ গোল, গড় ২.৯৯। নকআউটের ৩২ ম্যাচেও গোলের ধারা থামেনি। ৯৩ গোল, গড় ২.৯১। সাধারণত শিরোপার লড়াই যত ঘনিয়ে আসে, দলগুলো তত রক্ষণে আশ্রয় নেয়। অথচ এবার শেষ ষোলো থেকে ফাইনাল পর্যন্ত আক্রমণের আগুন জ্বলেছে সমান তেজে। এমনকি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড মিলে উপহার দিয়েছে ১০ গোলের অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। অবশ্য গ্রুপ পর্বে গোল বেশি হওয়ার একটি স্বাভাবিক কারণও রয়েছে। ৪৮ দলে বিশ্বকাপ সম্প্রসারিত হওয়ায় ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে। তাই মোট গোলের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে শুধু ম্যাচ বেশি হওয়ার কারণেই নয়। ম্যাচপ্রতি প্রায় তিন গোলের গড়ই বলে দেয়, দলগুলো শুরু থেকেই জয় ছিনিয়ে আনতে সাহসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল বেছে নিয়েছিল।

মোট গোলের হিসেবে ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ এখন ইতিহাসের শীর্ষে। তবে ম্যাচপ্রতি গোলের গড়ে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপ। মাত্র ২৬ ম্যাচে ১৪০ গোল, অবিশ্বাস্য ৫.৩৮ গোলের গড়। যে উচ্চতা আজও ইতিহাস হয়ে আছে। এরপর সর্বোচ্চ গোলগড়ের তালিকায় রয়েছে ১৯৩৮ (৪.৬৭), ১৯৫৮ (৩.৬০), ১৯৭০ (২.৯৭) এবং ২০২৬ (২.৯৬)। অর্থাৎ ১৯৭০ সালের পর এত প্রাণবন্ত, এত গোলসমৃদ্ধ বিশ্বকাপ আর দেখা যায়নি। গ্রুপ পর্বের গোলগড়েও ২০২৬ আসরকে ছাড়িয়ে আছে কেবল ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ।

৬৮ বছর পর বিশ্ব ফুটবল আবার দেখেছে এমন এক গ্রুপ পর্ব, যেখানে প্রতি ম্যাচেই গোল ছিল অবধারিত উৎসব। এই গোলের মিছিল কেবল স্ট্রাইকারদের কৃতিত্ব নয়। উইঙ্গার, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, সেন্টার-ব্যাক, ফুলব্যাক। এমনকি বদলি খেলোয়াড়রাও ছিলেন সমান কার্যকর। শুধু গ্রুপ পর্বেই বদলি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে এসেছে ৪৩ গোল, যা বিশ্বকাপের নতুন রেকর্ড। পাঁচ বদলির নিয়ম আধুনিক ফুটবলের কৌশলকে কতটা বদলে দিয়েছে, তার উজ্জ্বল প্রমাণ এই সংখ্যা।

পরিসংখ্যান আরো জানায়, উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন, উইং বদলে আক্রমণ গড়া, সেট-পিসের কার্যকারিতা এবং গোলরক্ষকদের দীর্ঘ পাস। সব মিলিয়ে গোল তৈরির নতুন এক বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত প্রতিভার সঙ্গে কৌশলগত শৃঙ্খলার এই মেলবন্ধনই এবারের উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপকে আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তবু গোলের এই সাগরে সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্পটি লিখেছে স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেই তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যেন এই বিশ্বকাপ একসঙ্গে দুইটি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। আক্রমণ ম্যাচ জেতায়, কিন্তু শিরোপা জিততে প্রয়োজন দুর্ভেদ্য রক্ষণ। ৩০৮ গোল মানে শুধু ৩০৮টি স্কোরলাইন নয়। এটি ৩০৮টি উল্লাস, ৩০৮টি কান্না, ৩০৮টি স্বপ্নপূরণ কিংবা স্বপ্নভঙ্গ।

১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৭০ গোল দিয়ে। ১৯৫৪ বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল গোলগড়ের কিংবদন্তি। ১৯৯৮ আসর শুরু করেছিল ৩২ দলের যুগ। আর ২০২৬? ইতিহাস এই আসরকে মনে রাখবে সেই বিশ্বকাপ হিসেবে; যেখানে ফুটবল আবার নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় গোলের প্রেমে পড়েছিল।

ইত্তেফাক/এনএন