হাম-ডেঙ্গুতে মৃত্যু থামছে না!

এ পর্যন্ত হামে ৮০৩ শিশুর মৃত্যু, ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩৮

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৮

দেশের প্রতি ঘরে এখন হাম ও ডেঙ্গুর আতঙ্কে দিন কাটছে মানুষের। অভিভাবকরা বলছেন, ‘চার দেওয়ালে বন্দি করে শিশুকে হাম থেকে রক্ষা করতে পারলেও, ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করতে পারছি না’। অন্যদিকে স্বল্প আয়ের দরিদ্র অভিভাবকরা বলছেন—‘আমরা বাচ্চাদের কোনভাবেই হাম-ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করতে পারছি না’। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে; মৃত্যু হয়েছে আট শতাধিক। একইভাবে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে জন্ম নিচ্ছে ডেঙ্গুর লার্ভা। ফলে সারা দেশেই বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে দেশে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি রোগী, আর মৃত্যু হয়েছে ৩৮ জনের।

হাম প্রতিরোধে সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হলেও এখনো অনেক শিশু টিকাদানের বাইরে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে টিকা না পাওয়া শিশুরাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কিছুটা কমার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক রয়ে গেছে।

এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে লার্ভা ধ্বংস, ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা, ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি, দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন প্রেরণ এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনা মূল্যে করার সুবিধা দিয়েছে সরকার। তবে এত সব কার্যক্রম কাজে আসছে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আসছে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু   আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশের মানুষকে মশারি টানিয়ে ঘুমানো এবং ফুল স্লিপের শার্ট ও প্যান্ট পরার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি লার্ভা নিধনে ট্যাবলেট ছিটিয়ে যাচ্ছি।           

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, জুন মাস থেকে ডেঙ্গুর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে তো উদ্বেগ বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে মে থেকে জুনে অনেক বেশি, আবার জুন থেকে জুলাইয়ে রোগী আরো বেশি। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে—সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরো বাড়তে পারে। এবারে যেভাবে ব্যাপক বৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে ডেঙ্গি প্রজননের জায়গা অনেক বেড়ে গেছে এবং সামনের যে বৃষ্টিগুলো হবে এটা একটা ক্রিটিক্যাল ফ্যাক্টর হিসেবে আসবে। এতে করে প্রজননের জায়গা বেড়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে রোগী অনেক বেড়ে যেতে পারে এবং সেটা অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রবণতা থাকবে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন উচিত হলো—প্রজননের এই জায়গাগুলো অপসারণ করা। বিভিন্ন যে প্লাস্টিক বা অন্য পণ্যগুলো আছে যেগুলোতে পানি জমে থাকে, সেগুলোতে পানি যেনো জমতে না পারে সেটা যদি নিশ্চিত করা যায় এবং পাশাপাশি ভালো ভাবে লার্ভা ধ্বংস করা যায়, তাহলে হয়তো বা ডেঙ্গু রোগী কিছুটা কমানো যেতে পারে। আর তা না হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, নতুন করে হামে আক্রান্ত শিশু খুব কমই আসছে। তবে পুরোনো যারা আক্রান্ত হয়েছিল ওদের মধ্যে থেকে অনেকে আবার নতুন করে ইনফেকশন নিয়ে হাসপাতালে আসছে। যেমন ডায়রিয়া, নিমোনিয়া আবার হচ্ছে। একবার ভালো হয়ে গেছে, সপ্তাহখানিক পরে বা দুই সপ্তাহ পরে তারা আবার ফিরছে কমপ্লিকেশন নিয়ে এবং এগুলো সহজে ভালো হচ্ছে না। তাদের মধ্যে থেকে অনেকে মারাও যাচ্ছে। এই জন্য মৃত্যুর হারটা বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু হামে নতুন আক্রান্ত কমেছে।

এই শিশু বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, যারা ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছে, ওদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যে কারণে ঐ শিশুরা ভালো হয়ে চলে গেছেও ফের বাইরে জনসমাগমে মিশে অন্য জটিলতা নিয়ে আসছে। অর্থাত্ সেকেন্ডারি ইনফেকশনে শিকার হচ্ছে। এটা হাম নয়, এটা হাম পরবর্তী জটিলতা। শ্বাসকষ্ট, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া—এগুলো জটিলতা নিয়ে আসছে। তারা মিনিমাম একমাস আগে হামে আক্রান্ত ছিল। তারাই এখন ভর্তি হচ্ছে বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে।

হাম পরিস্থিতি: মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯০৪ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৩৩ জন। এ সময়ের মধ্যে হাম উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৬ শিশুর। গত ১৫ মার্চ হতে এ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০৮ এবং নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৫। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮ জন। সন্দেহজনক হাম রোগীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন ৯৯ হাজার ২৯৪ জন। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি: ডেঙ্গুতে আরো ৩৭৫ জন সারা দেশে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এ নিয়ে চলতি বছর আক্রান্ত ১১ হাজার ৫৭০ জন এবং এ সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩৮ জনের।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: জ্বর হলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে। চিকিৎসক প্রয়োজনে একটি বা দুটি পরীক্ষা করে জ্বরের ধরণটি নির্ণয় করবে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা নিবেন। ২০১৯ এ ডেঙ্গুর যে মহামারি হয়েছিল এবারে রোগীর সংখ্যা সেরকম না হলেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাবে। এটা থেকে বাঁচার জন্য এডিস মশা এবং লার্ভা এই দুটাকে নির্মূল করার জন্য রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত একটি সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি।

ইত্তেফাক/এনএন