বিচারকসংকটে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সম্প্রতি আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি অবসরে যাওয়ায় এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিচারকসংকটের কারণে আপিল বিভাগে একাধিক বেঞ্চ গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করাও সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুতই আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
তারা বলছেন, দিনে দিনে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতে মামলার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হলেও বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজারে। এর মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলাও নিষ্পত্তির অক্ষোয় রয়েছে। বিচারাধীন এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একাধিক বেঞ্চ গঠন করা দরকার। কিন্তু বিচারকসংকটের কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যোগ্য, দক্ষ ও সত্ বিচারকদের আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত। তাহলে মামলা জট নিরসনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ চার জন বিচারক রয়েছেন। অতীতে ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে বিচারক ছিল ১১ জন। এরপর আর কখনোই আপিল বিভাগে এতসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পাঁচ দিন পর ছাত্র-জনতার দাবির মুখে তত্কালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও আপিল বিভাগের পাঁচ জন বিচারপতি পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপরই হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর ঐ বছরের ১২ আগস্ট আপিল বিভাগে আরো চার জন বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ছয় জনে। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাসে বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। আর জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামকে প্রধান করে তিন জন বিচারপতির সমন্বয়ে আপিল বিভাগে আরেকটি বেঞ্চ গঠন করে দেন। ফলে তখন আপিল বিভাগের দুটি বেঞ্চে বিচারকাজ চলত।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে অবসরে যান আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল করিম। পরের বছরের মার্চ মাসে আপিল বিভাগে আরো দুজন বিচারপতি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তখন আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাত জনে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অবসরে যান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। চলতি বছর অবসরে যান বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। দুজন বিচারপতি অবসরে যাওয়ায় বিচারকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় চার জনে। ফলে বিচারক স্বল্পতার কারণে দুটি বেঞ্চ গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে অতীতে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালিত হয়েছে। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর তত্কালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আপিল বিভাগের আট জন বিচারককে নিয়েই তিনটি বেঞ্চ পুনর্গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করেছিলেন। তখন তিনটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালিত হওয়ায় মামলা নিষ্পত্তিতে গতি পেয়েছিল বলে জানান আইনজীবীরা।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদল ইত্তেফাককে বলেন, আপিল বিভাগে বিচারকসংকট রয়েছে। অবিলম্বে বিচারক নিয়োগ দেওয়া উচিত। এরকম সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া দরকার—যাতে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চ গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়। এটা করা গেলেই মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়বে। দুর্ভোগ লাঘব হবে বিচারপ্রার্থী জনগণের। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলেন, আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া দরকার। যাতে করে আরো দুটি বেঞ্চ গঠন করা যায়। যত বেশি বেঞ্চ গঠন করা যাবে, মামলা নিষ্পত্তির হার তত বাড়বে। যার সুফল পাবে দেশের বিচারপ্রার্থী মানুষ।
এদিকে আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। চিঠিতে বলা হয়েছে, আইনজীবী হিসেবে বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রত্যাশা, আদালতের কর্মব্যস্ততা এবং বিচারব্যবস্থার বাস্তব চিত্র প্রতিদিন খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হচ্ছে। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান লক্ষণীয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীদের মাঝে হতাশা বিরাজমান। বর্তমান সময়ে আইনের বিশেষায়িত শাখা-প্রশাখা বিকশিত হয়েছে। সেজন্য বিচারের ক্ষেত্রেও বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠন করা আবশ্যক। কিন্তু আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা কম হওয়ায় বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিচারাধীন মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা হ্রাস এবং বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতির নিয়োগ প্রদানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি।
প্রসঙ্গত: ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা ছিল চার জন। তখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৬টি। দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৪৩ লাখ। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ। এখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার ৭১৩টি। বিচারপতির সংখ্যা মাত্র চার জন। সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সালের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। তখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৬০টি। ২০১১ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১০ জন। বিচারাধীন মামলা ছিল ১২ হাজার ৪৪১টি। ২০১৩ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১০ জন। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৩৩৮টি। ২০১৭ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৯ জন। সে সময় বিচারাধীন মামলা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৫টি। ২০২২ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৯ জন। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৯২৮টি। ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ হাজার ১২০টিতে দাঁড়ায়। অর্থাত্ মামলার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও বিচারপতির সংখ্যা সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তিতে আপিল বিভাগে অধিকসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া দরকার। অধিকসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া গেলে তিনটি বেঞ্চ গঠন করা সম্ভব হবে। তাহলে মামলা জট নিরসন হবে বলে আশাবাদ আইনজীবীদের।

