বিশ্বকাপ চলাকালে অবৈধ সম্প্রচার, ব্রাজিলের ৩০৯টিসহ ২০০০ ওয়েবসাইট বন্ধ করলো যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮

বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় অবৈধভাবে সরাসরি ম্যাচ সম্প্রচার করা হাজারো পাইরেটেড ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীন এক অভিযানে নেমেছে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানে ব্রাজিলের ৩০৯টি ওয়েবসাইটসহ বিশ্বজুড়ে দুই হাজারের বেশি ডোমেইন পুরোপুরি জব্দ ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মূলত কাপের অফিশিয়াল সম্প্রচারস্বত্ব লঙ্ঘন করে কোনো রকম বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই বেআইনিভাবে সরাসরি খেলা সম্প্রচারের দায়ে এসব প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যেমন ব্রাজিলে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ সম্প্রচারের একচেটিয়া অধিকার কেবল গ্লোবো, এসবিটি এবং ক্যাজে টিভির হাতেই সংরক্ষিত ছিল।

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস এবং ন্যাশনাল ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের যৌথ সমন্বয়ে এই বিশ্বব্যাপী তদন্ত পরিচালিত হয়। এই বিশাল অভিযানে সরাসরি পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা, বেইন মিডিয়া গ্রুপ, এনবিসি ইউনিভার্সাল, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, ইউএফসি এবং বিশ্বখ্যাত পাইরেসিবিরোধী সংস্থা ‘অ্যালায়েন্স ফর ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ (এসিই)।

তদন্তকারীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এসব অবৈধ স্ট্রিমিং সাইট কেবল কপিরাইট বা সম্প্রচারস্বত্বই লঙ্ঘন করেনি, বরং সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের চরম সাইবার ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। কর্তৃপক্ষের মতে, অনুমোদনহীন এসব স্ট্রিমিং পোর্টালে ভিজিট করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অজান্তেই যন্ত্রে ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার প্রবেশ করতে পারে। একইসঙ্গে এর ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ, ক্রেডিট কার্ড নম্বরসহ স্পর্শকাতর সব ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চুরি হওয়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে।

'অপারেশন রেড কার্ড' নামের এই বহুমুখী আন্তর্জাতিক অভিযানে পুরো আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অংশ নেয়। ডিজিটাল পাইরেসি এবং অবৈধ ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রির বিরুদ্ধে চালানো এই মেগা অপারেশনে দেশভিত্তিক বন্ধ হওয়া ডোমেইনের তালিকা:

  • কলম্বিয়া: ১,১৪০টি

  • ব্রাজিল: ৩০৯টি

  • ডোমিনিকান রিপাবলিক: ২৫৬টি

  • ইকুয়েডর: ২২৩টি

  • পেরু: ২৮টি

  • আর্জেন্টিনা: ১৪টি

ওয়েবসাইট ডাউন করার পাশাপাশি কলম্বিয়ায় নকল ক্রীড়াসামগ্রী তৈরি ও বিপণনের অভিযোগে ১৩টি বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হয়, যেখান থেকে চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

অপারেশনের দ্বিতীয় দফায় গত ১০ জুলাই কলম্বিয়ার সাইবার গোয়েন্দারা 'লস সিবেরইনফিলত্রাদোস' নামক একটি মারাত্মক সাইবার অপরাধী দলের চার সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ২০২৪ সাল থেকেই চক্রটি টেলিকম কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে বিশ্বকাপসহ বৈশ্বিক সব বড় ক্রীড়া আসরের আইপিটিভি সংকেত চুরি করে তা অবৈধভাবে বিক্রি করে আসছিল। আসামিরা ভুয়া লগইন পেজ, ভিপিএন (VPN), সিকিউরিটি কোড জালিয়াতি ও করপোরেট নেটওয়ার্কে হ্যাক করে অবৈধ সম্প্রচার চালিয়ে আসছিল।

আমেরিকার বাইরে ইউরোপ মহাদেশেও ডিজিটাল পাইরেসির বিরুদ্ধে সমান্তরাল অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা 'ইউরোপল' এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারীরা ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে বৈশ্বিক অবৈধ স্ট্রিমিং নেটওয়ার্কগুলো চিহ্নিত ও নিশ্চিহ্ন করতে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যায়।

বিশ্বকাপের মতো মেগা স্পোর্টিং ইভেন্টে সম্প্রচারস্বত্ব ও স্বত্বাধিকারীদের অধিকার রক্ষায় চালানো এই মেগা অভিযানকে ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল পাইরেসি পুরোপুরি নিমূল করতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক অভিযান অব্যাহত রাখা হবে বলে নিশ্চিত করেছে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ।

ইত্তেফাক/এএম