সিরাজগঞ্জে ছয় মাসে ১২০ আত্মহত্যা, বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩৫

সিরাজগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আত্মহত্যা করেছেন ১২০ জন। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বজনদের কান্না এবং অপূরণীয় ক্ষতির গল্প।

উদ্বেগের বিষয় হলো, আত্মহত্যাকারীদের অধিকাংশই তরুণ-তরুণী। পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রেমঘটিত জটিলতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানিসহ নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ জেলায় মোট ১২০ জন আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ৬৮ জন পুরুষ এবং ৫২ জন নারী। গড়ে প্রতি মাসে ২০ জন এবং প্রতি সপ্তাহে প্রায় পাঁচজন আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যাকারীদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কয়েকজন কিশোরীও আত্মহত্যা করেছেন, যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পারিবারিক অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, অভাব-অনটন, প্রেমে ব্যর্থতা, পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে না পারা, ঋণের চাপ, সামাজিক অপমান, সাইবার বুলিং এবং মানসিক হতাশা।

সিরাজগঞ্জ রজব আলী মেমোরিয়াল বিজ্ঞান কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. বাবুল হোসেন বলেন, একসময় যৌথ পরিবার ছিল, যেখানে মানুষ সংকটের সময় অন্যদের কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পেত। বর্তমানে পরিবারগুলো ছোট হয়ে গেছে, সামাজিক যোগাযোগও কমে গেছে। ফলে অনেকেই নিজের কষ্ট নিজের মধ্যে চেপে রাখছেন। দীর্ঘদিনের হতাশা একসময় আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্তে রূপ নেয়। পরিবারে খোলামেলা আলোচনা, সন্তানদের সময় দেওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, “অনেক অভিভাবক এখন শুধু সন্তানের লেখাপড়া বা ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবেন, কিন্তু তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ নেন না। সামাজিক প্রতিযোগিতা, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তরুণদের হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আত্মহত্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান নয়। এটি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. হুমায়ুন কবির কর্নেল বলেন, পারিবারিক অশান্তি ও অর্থনৈতিক সংকট বর্তমানে আত্মহত্যার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা, দাম্পত্য কলহ, দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধ এবং অর্থনৈতিক চাপ থেকে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ আইনি সহায়তা বা সামাজিক সহযোগিতা নেওয়ার পরিবর্তে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

তিনি বলেন, পরিবারে সমস্যা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া উচিত। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সংকটের সময়ে মানুষ যেন সহজেই সহায়তা পায়, সে ধরনের সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।

আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক আবেগ, মানসিক চাপ এবং হতাশা বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

সিরাজগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাজরান রউফ বলেন, প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনার তদন্তে আমরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি। দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ সাময়িক সমস্যাকে স্থায়ী সমস্যা মনে করে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। সময়মতো কেউ পাশে দাঁড়ালে অনেক ঘটনাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।

তিনি জানান, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে কোনো মানুষ সংকটের সময়ে নিজেকে একা মনে না করেন।

সিরাজগঞ্জ শহরের মিরপুর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মো. বাবলু বলেন, আগে মানুষ বিপদে পড়লে প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন পাশে দাঁড়াতেন। এখন অনেকেই একা হয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন, সন্তানরাও তাদের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না। সমাজে মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা কমে গেছে। তাই পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আরও বেশি সময় দেওয়া এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, আত্মহত্যা এখন শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, নিয়মিত কাউন্সেলিং, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সামাজিক বন্ধন আরও শক্তিশালী করা, পারিবারিক সম্পর্ক উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত সামাজিক সংকোচ দূর করা গেলে এই উদ্বেগজনক প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

সিরাজগঞ্জে গত ছয় মাসের এই পরিসংখ্যান এখনই সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইত্তেফাক/এএইচপি