বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন থেকে নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ

সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে যত বিতর্ক

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৫

২০২৩ সালে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সাংবিধানিক ভূমিকা, বিতর্কিত সাক্ষাৎকার এবং সর্বশেষ পদত্যাগ, সব মিলিয়ে দায়িত্বকালজুড়েই তাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত

২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে।

রাজনৈতিক নেতাদের পরিবর্তে একজন সাবেক বিচারক ও আমলাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ায় আওয়ামী লীগের ভেতরেই অসন্তোষ দেখা দেয়। পরে নিজ জেলা পাবনার এক অনুষ্ঠানে নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় নতুন বিতর্কের জন্ম হয়।

শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম বিতর্ক

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ছবিটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

সমালোচকদের দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে এমন দৃশ্য সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সৌজন্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’ মন্তব্য নিয়ে আলোচনা

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে উপস্থাপক নবনীতা চৌধুরীর একটি ছবিতে সাহাবুদ্দিনের নামে থাকা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করা ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’ মন্তব্যের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

মন্তব্যটি তার প্রকৃত অ্যাকাউন্ট থেকে করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিষয়টি জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।

তিন সরকারের শপথবাক্য পাঠ

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।

এরপর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদেরও শপথবাক্য পাঠ করান তিনি। এই সময় তার সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেও শপথবাক্য পাঠ করান তিনি। তবে সরকার পরিবর্তনের পরও তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে এক সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি।

এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কারণ, ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি ভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।

সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ, ঘেরাও কর্মসূচি এবং নিরাপত্তা জোরদারের ঘটনাও ঘটে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা তখন বলেন, রাজনৈতিক দাবি থাকলেও রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সাংবিধানিকভাবে সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

বিতর্কের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানানো হয়। তাদের মতে, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনই তখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সর্বশেষ লন্ডনে চিকিৎসার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে সাহাবুদ্দিনের ফোনালাপের বিষয়টি সামনে আসার পর তাকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরে বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অবসরের পর তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সমন্বয়কারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০১ সালের পরবর্তী সহিংসতার তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জনকারী সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পেশায় তিনি আইনজীবী এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।

 

 
ইত্তেফাক/এসএ