কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও এআই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যোগে যুক্ত হলেন এনএমএসইউর বাংলাদেশি গবেষক

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৪২

নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটির (NMSU) পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. রেজা সুফিয়ান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এক যুগান্তকারী পদার্থবিজ্ঞান সিমুলেশন পরিচালনার জন্য একটি গবেষণাদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রায় ৮০ কোটি ডলারে পরিচালিত ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির (DOE) বড় ধরনের উদ্যোগ 'জেনেসিস মিশন' (Genesis Mission)-এর জন্য তার এই গবেষণা দলটি নির্বাচিত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সমন্বিত বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য-অনুসন্ধান প্ল্যাটফর্ম তৈরির লক্ষ্যে সুপারকম্পিউটার, কোয়ান্টাম সিস্টেম এবং এআই-কে একত্র করাই এই মিশনের মূল লক্ষ্য।

এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো আগামী এক দশকের মধ্যে আমেরিকার বৈজ্ঞানিক উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করা। ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে অনুষ্ঠিত জেনেসিস মিশন সামিটে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি মন্ত্রণালয় (DOE) এই ঘোষণা প্রদান করে। প্রথম ফেজে (Phase I) ফান্ডিং পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে ড. রেজার এই প্রকল্পটি স্থান করে নিয়েছে।

এনএমএসইউ-এর অভ্যন্তরীণ গবেষণা বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিশিয়া সুলিভান বলেন, "এই স্বীকৃতি ড. সুফিয়ানের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান গবেষণার বৈশ্বিক মানেরই প্রমাণ। তাঁর কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে—যা জেনেসিস মিশনের মূল দর্শনের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।"

প্রকল্পটির শিরোনাম "AI-Accelerated Non-Abelian Gauge Dynamics on Quantum Hardware"। ৯ মাস মেয়াদী এই প্রকল্পে ড. রেজা সুফিয়ান 'ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি' এবং 'ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ড'-এর গবেষকদের সাথে যৌথভাবে কাজ করবেন।

গবেষণার মূল কাজ হবে বর্তমান যুগের প্রাথমিক পর্যায়ের কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে গণনার ত্রুটি (calculation errors) কীভাবে দূর করা যায় তা পর্যবেক্ষণ করা। একই সাথে ভবিষ্যতের ত্রুটিমুক্ত (fault tolerant) কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জন্য এআই-চালিত ব্লুপ্রিন্ট বা ব্লুপ্রিন্ট নকশা তৈরি করা। এই গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন—কীভাবে সবল বল (strong force) থেকে দৃশ্যমান পদার্থের সৃষ্টি হয়—তার উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।

বর্তমান কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. রেজা সুফিয়ান বলেন, "আজকের কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলো বেশ 'নয়েজি' (noisy) এবং পরিবেশগত নানা বাধার কারণে গণনায় প্রচুর ভুল করে। আমাদের মূল ভাবনা হলো—শুধু হিসাব শেষ হওয়ার পর ফলাফলের ডেটা বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করা নয়, বরং কোয়ান্টাম হিসাবটির নকশা তৈরি, তা অপটিমাইজ করা এবং পরিচালনায় এআই-কে কাজে লাগানো। সহজ কথায়, এআই কাজ করবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের এক বুদ্ধিমান অনুবাদক ও কোচ হিসেবে।"

বাস্তব সময়ে এই ত্রুটি বা নয়েজ ফিল্টার করতে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যা আজকের সীমাবদ্ধ কোয়ান্টাম যন্ত্রগুলো দিয়েও অর্থপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

কাজের ধাপসমূহ (৯ মাসের পরিকল্পনা)

  • প্রথম ৩ মাস: টিমটি কণা ও বলক্ষেত্রের প্রতিসাম্য রক্ষাকারী (symmetry-preserving) রূপ নির্মাণ করবে এবং কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারের উপযোগী সার্কিট ডিজাইন করবে।

  • পরবর্তী ৩ মাস: এআই-অপটিমাইজড সার্কিটগুলোকে সরাসরি কোয়ান্টাম প্রসেসরে চালিয়ে 'কোয়ার্ক-অ্যান্টিকোয়ার্ক জোড়া'র বিবর্তন বিশ্লেষণ এবং স্ট্রিং টেনশন ও স্ট্রিং ব্রেকিং নিয়ে পড়াশোনা করা হবে।

  • শেষ ৩ মাস: সার্কিটের দক্ষতা বৃদ্ধি, ফলাফল যাচাই, আদর্শ পদ্ধতির সাথে এআই পদ্ধতির তুলনা এবং গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।

এই প্রকল্পটির মাধ্যমে এনএমএসইউ পদার্থবিজ্ঞান, এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং হাই-পারফর্মেন্স কম্পিউটিংয়ের মতো দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার এক বিশাল সুযোগ পেল। এতে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন, পাশাপাশি 'আইবিএম কোয়ান্টাম' (IBM Quantum) এবং অন্যান্য জাতীয় কোয়ান্টাম ল্যাবগুলোর সাথে সুসম্পর্ক তৈরি হবে।

'জেনেসিস মিশন'-এর মাধ্যমে আমেরিকান সরকার, টেক জায়ান্ট এবং ১৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় একসাথে যুক্ত হয়ে জাতীয় নিরাপত্তা, শক্তি ও বিজ্ঞান বিষয়ক ২৬টি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করছে। এই কনসোর্টিয়ামে দেশের ১৭টি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি সহ ৪১টি শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির আন্ডার সেক্রেটারি ফর সায়েন্স ও জেনেসিস মিশন ডিরেক্টর দারিও গিল (Darío Gil) জানান, আমেরিকা ছাড়া আর কোথাও এত বড় পরিসরে গবেষণার উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব নয় এবং এটি দেশের পুরো বৈজ্ঞানিক কাঠামোকে বদলে দিতে যাচ্ছে।

ইত্তেফাক/এএম