কে এই সুন্দর পিচাই?

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ২০:৩৭

ছোটোবেলা থেকে সংখ্যা মুখস্থ করতে ও মনে রাখতে তিনি পটু ছিলেন। ১২ বছর বয়সে তার বাবা প্রথম ল্যান্ড ফোন নিয়ে আসে। তিনি তখন ডায়াল করা সব নাম্বার মুখস্থ

বলে দিতে পারতেন

শাহ আকবর আহমেদ শুভ

 

সার্চ জায়েন্ট গুগল ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট একটি চমকপ্রদ খবর নিয়ে হাজির হয়। এইদিন গুগল ভারতের সুন্দর পিচাইকে গুগলের নতুন সিইও হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে  কোনো ভারতীয় দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাহলে শুনি এই সফল মানুষটির সাফল্যগাঁথার পিছনের জীবন-সংগ্রামের গল্প।

সুন্দর পিচাই-এর আসল নাম পিচাই সুন্দরা রাজন। তিনি ১৯৭২ সালের ১২ জুলাই ভারতের তামিলনাড়ু প্রদেশের মধুরাই অঞ্চলের একটি নিম্ন-মধ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়ো। বাবা রেগুনাথ পিচাই আমেরিকাভিত্তিক ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি জিইসিতে সহকারী ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। মা লক্ষনি পিচাই সুন্দরের জন্মের আগ পর্যন্ত শ্রুতি লেখক হিসেবে কাজ করতেন। চেন্নাই শহরের একটি ছোটো দুই রুমের ফ্ল্যাটে তার শৈশব কাটে। শৈশবে তিনি ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও দাবা ও ক্রিকেট খেলায় তার ঝোঁক ছিল। তিনি জহর বিদ্যালয় ও ভাণা বাণী বিদ্যালয় থেকে স্কুলজীবন শেষ করেন। ছোটোবেলা থেকে সংখ্যা মুখস্থ করতে ও মনে রাখতে তিনি পটু ছিলেন। ১২ বছর বয়সে তার বাবা প্রথম ল্যান্ড ফোন নিয়ে আসে। তিনি তখন ডায়াল করা সব নাম্বার মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। তিনি মাদ্রাজের আইআইটিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। কিন্তু আইআইটিতে ভর্তির জন্য তার যথেষ্ট র্যাঙ্ক ছিল না। পরবর্তীতে তিনি খড়গপুর আইআইটি থেকে ধাতব প্রকৌশলবিদ্যায় ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। অতঃপর আইআইটির অধ্যাপকের সুপারিশে তিনি ১৯৯৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ে থেকে পিএইচডি অর্জনের উদ্দেশ্যে আমেরিকায় পাড়ি জমান। কিন্তু পিএইচডির পরিবর্তে তিনি স্ট্যানফোর্ড থেকে ফলিত রসায়নে এমএস সম্পন্ন করেন। এমএস সম্পন্ন করে তিনি সিলিকন ভ্যালিতে প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেন। তবে সেখানে বেশিদিন চাকরি করেননি। চাকরি ছেড়ে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়া  থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। এমবিএ সম্পন্ন করার পর সুন্দর ম্যাকিঞ্জও কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে যোগদান করেন। ঠিক এই সময়টিতে তিনি তার একাকী জীবনের সঙ্গে একরকম যুদ্ধ করেছিলেন। নিজের জীবনের এই খারাপ সময়কে মোকাবিলা করে সাফল্য পাওয়া তার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। এ সময় তার বর্তমান স্ত্রী অঞ্জলি পিচাই তাকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেন। তার সকল সফলতার পিছনে অঞ্জলি পিচাই-এর অবদান রয়েছে। উল্লেখ্য যে, কেবল সুন্দরের জন্যই অঞ্জলি এমএস করতে আমেরিকায় যান। এবং পরবর্তীতে তারা পারিবারিক সম্মতিক্রমে বিবাহ সম্পন্ন করেন।

২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল এই প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব গুগলে যোগদান করেন। একই দিনে জিমেইল-এর পথ চলা শুরু হয়। গুগলে যোগদানের পর ২০০৬ সালে সুন্দর পিচাই-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে। মূলত তখন বেশিরভাগ মানুষ ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারকে ওয়েব ব্রাউজার হিসেবে ব্যবহার করত। অন্যদিকে ২০০৬ সাল থেকে মাইক্রোসফট তাদের নিজেদের সার্চ ইঞ্জিন বিংকে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার-এর ডিফল্ট সার্চ-এ যুক্ত করে। এ সময় গুগল তাদের ইউজার হারাতে বসে। ঠিক সেই বছর সুন্দর গুগলের টুলবার নিয়ে আসেন। এটি গুগলকে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে সাহায্য করে। কেননা একজন ইউজার খুব সহজেই গুগল টুলবার ইন্সটল করার মাধ্যমে সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগলকে ব্যবহার করতে পারবে। এরপর তিনি গুগল গিয়ার ও গুগল প্যাক লঞ্চ করেন। গুগল টুলবারের সফলতা সুন্দরকে নিজস্ব ব্রাউজার তৈরির পরিকল্পনা দেয়। তিনি গুগলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তখন গুগলের তত্কালীন সিইও এরিক স্মিথ ব্রাউজার তৈরিকে ব্যয়সাপেক্ষ উল্লেখ করে এটির ঘোর বিরোধিতা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা লরি পেজ ব্রাউজার তৈরির পক্ষে মত দেন। গুগল ক্রোম-এর আত্মপ্রকাশে সুন্দর পিচাই অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ২০০৮ সালে ক্রোমে সরাসরি গুগল সার্চ-এর সুবিধা যুক্ত হয়। এর ফলে খুব কম সময়ের মধ্যেই এটি জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রতিযোগী ব্রাউজারগুলোকে পিছনে ফেলে দেয়। এই সাফল্যের সুবাদে সুন্দর গুগলে নিজের অবস্থান মজবুত করে নেয়। সে বছরই তিনি গুগলের প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট-এর সহ-সভাপতি পদে নিযুক্ত হন। এর ফলে তিনি গুগলের প্রডাক্ট প্রেজেন্টেশনে আরো সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এবং নিজের অবস্থানকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। ২০১২ সালে গুগল অ্যাপস-এর প্রধান ডেভ গিওয়ারড গুগল ছেড়ে দিলে তিনি ক্রোম ও অ্যাপস-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। সহ-সভাপতি নিযুক্ত হয়েই তিনি ক্রম ও অ্যাপস-এর অগ্রগতিতে কাজ শুরু করে দেন। গুগল ড্রাইভ-এর পিছনে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন।

এছাড়া গুগল ভিডিও কোডে তার অবদান রয়েছে। ২০১৩ সালে এন্ড্রয়েড-এর প্রধান নির্বাহী এন্ড্রু রুবিন গুগল ছেড়ে দিলে তিনি রুবিনের স্থলাভিষিক্ত হন। ২০১৪ সালে তিনি এন্ড্রয়েড-১ নামের একটি প্রজেক্ট হাতে নেন। তার দক্ষ নেতৃত্বের ফলে আমেরিকার মোবাইল বাজারের শতকরা ৬৫ শতাংশ এন্ড্রয়েড দখল করে নেয়। একই বছরে তিনি গুগল প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট-এর সহ-সভাপতি থেকে নির্বাহী প্রধান হন। কর্মদক্ষতার বলে ধীরে ধীরে তিনি ল্যারি পেজের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। গুগলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবেও সবার কাছে পরিচিতি পেতে থাকেন। তখন থেকে গুগলের প্রতিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে থাকেন। ২০১৪ এর শেষের দিকে তিনি টুইটার এর সিইও হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব পান। টুইটার ছাড়াও তিনি মাইক্রোসফট এর সি ই ও হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব পান। গুগল সুন্দরকে ধরে রাখার লক্ষে প্রতি বছর প্রায় ২০ কোটি ডলার বেতন প্রদান করছে। একি সময় ল্যারি পেজ গুগলের মাতৃ প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। প্রতিষ্ঠাতা ও সহ প্রতিষ্ঠাতা অ্যালফাবেটকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার সুবাদে তারা সুন্দর পিচাই কে গুগলের নতুন সিইও হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রযুক্তিবিদরা তার দূরদর্শিতা, বাজারের চাহিদা পুরনের ক্ষমতা, নতুন নতুন ব্যবসা পরিকল্পনার ক্ষমতা, মানুষের কাছে প্রোডাক্টের গ্রহনযোগ্যতা তৈরির গুনের জন্য ল্যারি পেজের থেকেও তাকে সি ই ও হিসেবে এগিয়ে রাখছেন।