চোখ রাঙাইতেছে পিফাস নামের ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০

সভ্যতার ইতিহাসে ইহা এক অদ্ভুত পরিহাস-যেই বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে অধিক নিরাপদ, অধিক আরামদায়ক ও অধিক সমৃদ্ধ করিবার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই বিজ্ঞানেরই কিছু সৃষ্টি মানুষের রক্তপ্রবাহে অদৃশ্য বিপদের বীজ বপন করিয়া দেয়। ইহা অবশ্য বিজ্ঞানের দোষ নহে, সর্বাংশে মানুষেরই দোষ। সম্প্রতি ঢাকার নদী, লেক ও কলের পানিতে পিএফএএস বা পিফাস নামক তথাকথিত ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’-এর উপস্থিতির সংবাদ সেই নীরব বিপদেরই এক অশনিসংকেত বহন করিতেছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডিও) এবং আন্তর্জাতিক দূষণকারী নির্মূল নেটওয়ার্ক (আইপিইএন)-এর যৌথ গবেষণা আমাদের এমন এক বাস্তবতার সম্মুখে দাঁড় করাইয়াছে। গবেষণায় পরীক্ষিত অধিকাংশ পানির নমুনাতেই পিফাসের উপস্থিতি ধরা পড়িয়াছে। বহু নমুনায় ইহার মাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের নিরাপদ সীমা বহুলাংশে অতিক্রম করিয়াছে। কোথাও কোথাও বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ পিএফওএ, পিএফওএস ও পিএফএইচএক্সএসেরও সন্ধান মিলিয়াছে। বিস্ময়ের বিষয়, পরীক্ষিত পাঁচটি পোশাকের প্রত্যেকটিতেই পিফাস শনাক্ত হইয়াছে এবং একটি জ্যাকেটে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের উপস্থিতিও ধরা পড়িয়াছে। শিল্পাঞ্চল-সংলগ্ন জলপথে দূষণের মাত্রা আরও উদ্বেগজনক বলিয়াই গবেষণাটি ইঙ্গিত করিয়াছে।

পিফাসকে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। ইহা প্রকৃত অর্থেই দীর্ঘকাল পরিবেশে টিকিয়া থাকে। মাটিতে প্রবেশ করিলে মাটির সহিত, নদীতে পড়িলে নদীর সহিত, শরীরে প্রবেশ করিলে শরীরের সহিত এক প্রকার অবাঞ্ছিত সহাবস্থানে আবদ্ধ হয়। গবেষণায় বলা হইয়াছে, ইহার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ উর্বরতা, ভ্রূণের বিকাশ, থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও যকৃতের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলিতে পারে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করিতে পারে। অর্থাৎ ইহা কেবল একটি রাসায়নিকের নাম নহে-ইহা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা-এই তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়াইয়া থাকা এক নীরব সংকেত।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প জাতীয় অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলির অন্যতম বটে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শিল্পোন্নয়নের ইতিহাসের সহিত এই খাত অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কিন্তু একটি সভ্য সমাজ কখনো এমন অর্থনীতি নির্মাণ করে না, যাহার মুনাফা নদীর জলে দ্রবীভূত হয় এবং যাহার মূল্য পরিশোধ করে শিশুদের শরীর। শিল্পের বিরোধিতা নহে, দায়িত্বহীন শিল্পায়নের বিরোধিতা না-করাটাই উদাসীনতা। যেই উৎপাদন নিজের বর্জ্যের দায় স্বীকার করে না, তাহা শেষ পর্যন্ত নিজের সাফল্যকেও অস্বীকার করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল-দেশে পিফাস নিয়ন্ত্রণের জন্য এখনো সুস্পষ্ট জাতীয় মানদণ্ড বা আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এই জন্যই গবেষণাটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সহিত তুলনা করিতে হইয়াছে। অথচ আমরা স্টকহোম কনভেনশনের সদস্য। অতএব এখনই প্রয়োজন পিফাস-সংক্রান্ত পৃথক নীতি প্রণয়ন, শিল্পবর্জ্যের বাধ্যতামূলক পরীক্ষা, নিয়মিত নদী ও কলের পানির পর্যবেক্ষণ, জনসমক্ষে ফলাফল প্রকাশ এবং নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারে শিল্পকারখানাকে বাধ্য করা। গবেষণাপত্র গ্রন্থাগারের তাক অলংকৃত করিবার জন্য নহে, রাষ্ট্রের নীতিকে আলোকিত করিবার জন্য।

বস্তুত, এই সংকট কেবল সরকারের নহে, শিল্পমালিকেরও। আবার কেবল শিল্পমালিকেরই নহে, নাগরিকেরও। আমরা এখনো বিশুদ্ধ পানিকে ব্যক্তিগত ফিল্টারের প্রশ্ন বলিয়া ভাবিতে অভ্যস্ত। কিন্তু পানি কাহারো ব্যক্তিগত নহে, নদীও ব্যক্তিগত নহে। পানি একটি সামাজিক সম্পদ। এক মানুষের দূষণ শেষ পর্যন্ত সকল মানুষের পানপাত্রে উপস্থিত হয়। অতএব পরিবেশরক্ষাও ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বিষয় নহে-ইহা সামাজিক ন্যায়বিচারেরই অংশ। পানিকে আমরা জীবন বলিয়া অভিহিত করি, কিন্তু সেই জীবনের ভিতর যদি অদৃশ্য মৃত্যুর দীর্ঘ ছায়া প্রবেশ করে, তাহা হইলে উন্নয়নের সকল পরিসংখ্যান অর্থহীন হইয়া পড়ে। কারণ, বিষের ভয়াবহতা তাহার তীব্রতায় যতটা, নীরবতায় তাহার চাইতে কম নহে। যেই বিষ ধীরে ধীরে মানুষকে গ্রাস করে, ইতিহাসে তাহার ক্ষতই সর্বাধিক গভীর হয়। সুতরাং অতি সত্বর পিফাসের মতো ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’কে জলে-স্থলে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করিবার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।

ইত্তেফাক/এমএস