হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস
শরতের নীল আকাশ আর সবুজে ভরা প্রাকৃতির অপার দান সিলেট। হাওর, নদীনালা, টিলা, চা-বাগান, দূরে সফেদ ঝরনা আর বনবনানীতে সৌন্দর্যে ভরা এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট সারাদেশের ভ্রমণপিয়াসি মানুষ। এবার ঈদুল আজহার ছুটিতে সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষণীয়। কেউবা হাওরের অথৈ নীল জলে, কেউবা পাহাড়ি নদীতে আর কেউ ঝরনার পানিতে লুটি পুটি খাচ্ছেন।
বছর জুড়েই পর্যটকদের ভিড় থাকে সিলেটে। ঈদ-পূজাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ছুটিতে ভ্রমণপিয়াসি মানুষের ঢল নামে সিলেট। তখন হোটেল-মোটেলে সিট-সংকট দেখা দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদের টানা ছুটিতে সিলেটের চা-বাগান, জাফলং জিরোপয়েন্টে, জিরোপয়েন্ট ঘেঁষা ভারতীয় ঝুলন্ত ব্রিজ, ফাটাছড়া মায়াবী ঝরনা, মাধবকুন্ড, বিছনাকান্দি, শ্রীপুর, রাতারগুল, পান্তুমাই, হাকালুকি, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ টাঙ্গুয়াসহ সিলেটের নয়নাভিরাম নান্দনিক পর্যটন স্পটসমূহে নানা বয়সের লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। দিগন্ত জোড়া পাহাড়, ছোটো বড়ো টিলা, সবুজ গাছের সারি, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ স্ফটিক জল, নুড়ি পাথর, চা বাগান, গহিন বন, হিজল করচের অরণ্য ঘেরা সবুজ বেষ্টনী, সবুজ পাহাড়ে সফেদ ঝরনা ধারা মনমুগ্ধকর দৃশ্য ।
এবার পর্যটক নিরাপত্তায় গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন, জৈন্তা থানা পুলিশ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকা ভাড়া নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান ঘটিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গোয়াইনঘাটের দর্শনীয় স্থানসমূহে একাধিক মেডিক্যাল টিম, ফায়ার সার্ভিস, তথ্য কেন্দ্র, পুলিশের একাধিক টিম চোখে পড়ার মতো।
নীলে ঢাকা টাঙ্গুয়ার হাতছানি
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রুপ জলমহালগুলোর অন্যতম। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বিপুল সম্ভাবনা এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য এই হাওরে। আকাশের যত নীল সব গিয়ে যেন ঠেকেছে টাঙ্গুয়ার জলরাশিতে। এক নয়ন জুড়ানো দৃশ্য।
দেশের উত্তর-পূর্ব কোণে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলার জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ মিঠাপানির এ হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার এলাকা। যেখানে রয়েছে সারি সারি হিজল-করচ গাছ গলা পর্যন্ত ভিজিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আর পাখির কলতান যে কাউকে বিস্মিত করে। মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম টাঙ্গুয়ার হাওর। একসময় এর এত পরিচিতি ছিল মাছ ও পাখি শিকারিদের কাছে। বিগত কয়েক বছরে টাঙ্গুয়া হয়ে উঠেছে ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণীয় স্থানে।
১৯৯১ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে রামসার কনভেনশন অনুযায়ী টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত হয়। জলজ উদ্ভিদ ও সম্পদে সমৃদ্ধ মিঠাপানির এই টাঙ্গুয়াকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি। ২০০৫ সালে এটিকে জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। তারপর থেকেই টাঙ্গুয়ার জীববৈচিত্র্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার তথা বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা।
ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ১৮টি মৌজায় ৫২টি হাওরের সমন্বয়ে ৯৭২ হেক্টর এলাকা নিয়ে এই হাওর জেলার সবচেয়ে বড়ো জলাভূমি। শুষ্ক মৌসুমে এই হাওরের অন্তর্গত ৫১টি জলমহালের আয়তন ৬ হাজার ৯১২ একর হলেও বর্ষায় তা বেড়ে ২৪ হাজার একরের বিশাল সাগরে পরিণত হয়।
শীতে এই হাওরে নানা প্রজাতির পরিযায়ী অতিথি পাখির কলরব মুগ্ধ করে। বর্ষায় থই থই করে পুরো হাওর। সাগর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করেন শত শত পর্যটক।
