বাড়িতে বাবার নিথর দেহ পড়ে আছে। চারপাশে চলছে স্বজনদের আহাজারি। এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন মাসুমা আক্তার (১৮) নামের এক শিক্ষার্থী। বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে যশোরের বেনাপোল কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেন তিনি। পরীক্ষা শেষে দুপুরে বাড়ি ফিরে বাবার জানাজা ও দাফনে অংশ নেন এই পরীক্ষার্থী।
মারা যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম আব্দুস সামাদ (৬৫)। তিনি বেনাপোল পৌর এলাকার নামাজগ্রামের বাসিন্দা। পেশায় তিনি একজন বিশিষ্ট আমদানিকারক এবং মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্ট ও হাজী মুছা করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যায় হঠাৎ স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন।
মাসুমা আক্তার শার্শা উপজেলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও স্বজনদের সান্ত্বনা ও উৎসাহে বুধবার সকাল ১০টার আগেই বেনাপোল কলেজ কেন্দ্রে উপস্থিত হন। সহপাঠী ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় নির্ধারিত আসনেই পরীক্ষা দেন তিনি। তবে দুপুর ১টায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে ১২টার দিকে খাতা জমা দিয়ে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান মাসুমা।
চরম শোকের মধ্যেও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে মাসুমা জানান, বাবা তাকে অনেক ভালোবাসতেন এবং তাকে উচ্চশিক্ষিত হিসেবে দেখার স্বপ্ন দেখতেন। বাবার আত্মাকে কষ্ট না দিতে এবং তার স্বপ্ন পূরণ করতেই এই কঠিন সময়ে তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন।
নিহতের বড় ভাই আব্দুল গফুর জানান, পরীক্ষা শেষে মাসুমা বাড়ি ফেরার পর জোহরের নামাজের পর গ্রামের মসজিদে আব্দুস সামাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
পরীক্ষাকেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বেনাপোল কলেজের কেন্দ্রসচিব ও অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান শান্তি জানান, সকালে পরীক্ষার্থীর বাবার মৃত্যুর বিষয়টি তারা জানতে পেরেছিলেন। মেয়েটি যেন নিজেকে স্বাভাবিক মনে করে, সে জন্য তাকে অন্য সবার সঙ্গেই বসতে দেওয়া হয়। এক হাতে চোখের পানি মুছে অন্য হাতে সে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখেছে।
শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ হাসানুজ্জামান অনুপম জানান, মাসুমা অত্যন্ত মেধাবী ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। সহপাঠীরা সকালে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে। শোক কাটিয়ে সে যেন ভালোভাবে পরীক্ষা শেষ করতে পারে, সে জন্য শিক্ষকেরা তাকে প্রয়োজনীয় মানসিক সহযোগিতা দিয়েছেন।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ বলেন, বাবা হারানোর শোক নিয়ে পরীক্ষায় বসা যে কারও জন্যই অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এমন পরিস্থিতিতেও ওই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তার পরীক্ষার সময় সর্বোচ্চ সহানুভূতিশীল থাকার চেষ্টা করা হয়েছে।

