চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন। একসময় হাতে ছিল ক্রিকেট বল, স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর।
কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ ছেড়ে কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’। খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠা এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে অবশেষে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় যৌথ অভিযানে তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কোতোয়ালি মডেল থানা ও যশোর জেলা পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘদিন নজরদারির পর তার অবস্থান শনাক্ত করে এই অভিযান চালানো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে বড় হয় সে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। এলাকার মাঠ থেকে শুরু হওয়া ক্রিকেটের পথ তাকে নিয়ে আসে চট্টগ্রাম শহরে। ২০১৯ সালের দিকে যোগ দেয় ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে। নিয়মিত অনুশীলন করত বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি এলাকায়। বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে দ্রুতই পরিচিতি পায় ইমন। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অনুসরণ করত সে। ক্রিকেট নিয়েই ছিল তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন, ‘ইমন খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। বেশি কথা বলত না। নিয়মিত অনুশীলন করত। করোনার সময়ের পর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। এরপর একদিন গণমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে আলোচনায় আসে। তখন জানতে পারি, সেই ছেলেটিই মোবারক হোসেন ইমন।’
ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর মোবারক হোসেন ইমন কীভাবে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে রয়েছে নানা তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন করে আলোচনায় আসে সে। ওই সময় থেকেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য মেলে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিজের ভয়ংকর সাহসের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিতি পায় ডেভিড ইমন। সাজ্জাদ গ্রুপের কার্যক্রম চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত ছিল। পাশাপাশি জেলার রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এলাকায়ও এ চক্রের সদস্যদের তৎপরতার তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, অস্ত্র পরিচালনায় বেশ পারদর্শী ডেভিড ইমন। তার ১৫-২০টি অস্ত্র বহনের ছবি পুলিশের কাছে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের আরেক সহযোগী ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম মাঠপর্যায়ে বড় সাজ্জাদের হয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করে।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের নাম আসে। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় আলোচিত জোড়া খুনে নাম উঠে আসে তার । একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়। সর্বশেষ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসে এই ডেভিড ইমন।

