ব্যবসার আনুষ্ঠানিকীকরণ এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড), শিল্প মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও আনুষ্ঠানিকীকরণের অনুকূল পরিবেশ’ শীর্ষক জাতীয় পরামর্শসভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পসচিব আবদুন নাসের খান বলেন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা গেলে ব্যবসার আনুষ্ঠানিকীকরণে গতি আসবে। এ লক্ষ্যে শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে একটি ডিরেগুলেশন অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে। তিনি জানান, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) আরও কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, নতুন প্রকাশিত বিজনেস লাইসেন্সিং গাইডবুক উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদনের তথ্য সহজলভ্য করবে। একই সঙ্গে সমন্বিত ইউটিলিটি সংযোগ, যৌথ পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং আইনগত ভিত্তিতে সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। সরকারের ১০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণে অন্তত এক লাখ নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য নিয়ন্ত্রক বাধা কমানোর ওপরও জোর দেন।
মূল প্রবন্ধে বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক জটিলতার কারণে উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকের বেশি সৃষ্টি করলেও দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট এখনও অনানুষ্ঠানিক। তিনি জানান, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যবসা পরিচালনায় ৩১টি পর্যন্ত লাইসেন্স, ২৩৫টির বেশি নথি এবং প্রায় ৬৫০ দিন সময় লাগে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে ৩০টি লাইসেন্সের জন্য ২০০টির বেশি নথি জমা দিতে হয় এবং প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় ৬০০ দিন লাগে।
এসব সমস্যা সমাধানে সিঙ্গেল ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি নম্বর, ওয়ান-স্টপ লাইসেন্সিং প্ল্যাটফর্ম এবং দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীদের কমপ্লায়েন্স ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
আইএলও’র প্রতিনিধি পিটার জুনিয়র বেলেন বলেন, দেশের প্রতি ১০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় আটজন অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের আনুষ্ঠানিক ও শোভন কর্মসংস্থানের আওতায় আনা জরুরি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আইএলও’র কারিগরি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)-এর রেজিস্ট্রার এ কে এম নুরুন্নবী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. শামসুল হক, এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম হাসান সাত্তার এবং এসকে বি স্টেইনলেস মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাইফুর রহমান। তারা ট্রেড লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ গঠন, এসএমই ঋণের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, নারী উদ্যোক্তাদের কর ও অডিট-সংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরামর্শসভায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।

