প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। বাদ যাচ্ছে না পরিবহন চালক ও শ্রমিকরাও। চালকের গতির নেশায় প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষের। কিন্তু এর পরেও সতর্ক হচ্ছেন না চালকরা। তাদের বেপরোয়া আচরণ ও অতিরিক্ত গতির কারণে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। আর ঈদ আসলেই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যায় অনেক। গত কয়েক দিনে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬১ জন। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহের গৌরীপুরে বাস ওভারটেকিং করতে গিয়ে প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ছেলেমেয়ে ও বাবা-মাসহ পাঁচ জন।
গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সারাদেশে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৪২ জন। আহত হয়েছিলেন কয়েকশ’। হাইওয়ে পুলিশের সাবেক ডিআইজি আতিকুল ইসলাম বলেন, ঈদ পরবর্তী সময়ে সড়ক থাকে অনেকটাই ফাঁকা। বিশেষ করে এ সময় যানবাহনগুলো অতিরিক্ত গতিতে চলতে থাকে। পাশাপাশি সড়কে নিরাপত্তাও শিথিল থাকে। ফলে ফাঁকা সড়ক পেয়ে চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের আগে মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি নজরদারি থাকে। ঈদ পরবর্তী সময়ে তা দেখা যায় না। এ সময়ে ফাঁকা সড়ক পেয়ে পরিবহনের চালকরা বেপরোয়া গতিতে যান চালানোর কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে।
এদিকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ। দুর্ঘটনার কারণ সংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এআরআই এই চিত্র পায় বলে জানানো হয়।
পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাসড়কগুলোতে অধিকাংশ বাস ৮০ কিলোমিটার গতির ওপর চলে। এই গতি নিয়ে পরিবহনগুলো একটি আরেকটিকে পাশ কাটিয়ে (ওভারটেক) যাওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এই পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা পরিবহনের সঙ্গে যখন মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় তখনই ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত প্রতিটি যানবাহনের অবস্থা দেখলেই এর ভয়াবহতার আসল চিত্র ফুটে ওঠে। অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা যাবে না।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গঠিত সামাজিক আন্দোলন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জন নিহত হয়। আহত হয় ৭ হাজার ৪২৫ জন। জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ২০৬ জন কম ছিল। ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৫ হাজার ৬৪৫ জন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৮ সালে বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বড়ো বড়ো শহর ও মহাসড়কে। ২০১৭ সালে বাস দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি থাকলেও ২০১৮ সালে ট্রাক ও কার্ভাডভ্যান মিলিয়ে সর্বোচ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৫ শতাংশ।
গত ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে ও পরের ১৪ দিনে সারাদেশে ১৫৩টি দুর্ঘটনায় ২০১ জন নিহত হয়। আহত হয় ৪০৯ জন। ১৪ জুন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ২০১৬ সালে ঈদুল ফিতরের আগে ও পরের ১৩ দিনে ১২১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮৬ জন নিহত হয়। আহত হয় ৭৪৬ জন। ২০১৭ সালে ঈদের ছুটিতে সারাদেশে ২০৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ২৭৪ জন। আহত হয় ৮৪৮ জন। ২০১৮ সালে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হয় বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে তথ্য দেওয়া হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির নেতা হোসেন আহমেদ মজুমদার বলেন, ঈদে অনেক পেশাদার চালক ছুটিতে যান। এই সুযোগে অপেশাদার চালকদের হাতে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব পড়ে। ফলে ফাঁকা সড়কে যাত্রী বেশি পাওয়ার লোভে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোয় দুর্ঘটনা ঘটছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যাত্রী বৃদ্ধির ফলে ট্রিপ বেশি, বেশি ট্রিপ দিতে গিয়ে বেপরোয়া গতি, সড়কে অবৈধ চালক এবং যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, যাত্রীদের তাড়াহুড়োর মানসিকতা, নিয়ম ভঙ্গ করে ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা, চালকদের দীর্ঘ সময় ধরে বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ না করার কারণে দুর্ঘটনা কমছে না।
