বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও সেই সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, ৩৬টি দেশে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কর্মী গেছেন মাত্র তিনটি দেশে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাষাগত সমস্যাসহ দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, বিদেশি নিয়োগকারীদের চাহিদার সঙ্গে দক্ষতার অমিল এবং নতুন বাজারে নিয়মিত কর্মী সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বোয়েসেলের প্রকাশিত দেশভিত্তিক কর্মী গমনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রুনেই—এই তিন দেশেই সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠানো হয়েছে। বিপরীতে তালিকাভুক্ত অনেক দেশে কর্মী গেছেন হাতেগোনা কয়েকজন, আবার কোনো কোনো বছরে একেবারেই পাঠানো সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল নতুন বাজারের সংখ্যা বাড়লেই হবে না; সেই বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে না পারলে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না।
বোয়েসেলের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, মালদ্বীপ, ফিজি, রাশিয়াসহ কয়েকটি নতুন বাজারে প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব দেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে জর্ডান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নিয়োগব্যবস্থা থাকায় সেখানেই কর্মী পাঠানোর প্রবণতা বেশি।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারে এখন নির্মাণ শ্রমিকের পাশাপাশি ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, কেয়ারগিভার, নার্স, মেশিন অপারেটর, হসপিটালিটি কর্মী এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপসহ অনেক অঞ্চলে জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং শ্রমিক সংকটের কারণে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগও সমপ্রসারিত হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে দক্ষ জনশক্তির সরবরাহ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক বিদেশি নিয়োগকারী নির্দিষ্ট দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী চান। কিন্তু দেশে সেই মানের কর্মী পর্যাপ্ত সংখ্যায় তৈরি না হওয়ায় অনেক সম্ভাবনাময় বাজারে নিয়মিত কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না।
এদিকে, বোয়েসেল নতুন বাজার অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঐ অর্থবছরে মালয়েশিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, ফিজি, রাশিয়া, মালদ্বীপ, ব্রুনেই ও লেবাননসহ একাধিক নতুন বাজারে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, নৈতিক ও তুলনামূলক কম খরচে অভিবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাজার সমপ্রসারণের পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের সনদ এবং বিদেশি নিয়োগকারীদের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তা না হলে নতুন বাজারের তালিকা দীর্ঘ হলেও কর্মী রপ্তানি কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
উল্লেখ্য, বোয়েসেল রাষ্ট্রায়ত্ত একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। তবে বাংলাদেশ থেকে মোট কত কর্মী বিদেশে গেছেন, তার সরকারি পরিসংখ্যান সংরক্ষণ ও প্রকাশ করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সামপ্রতিক বছরগুলোতে দেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থান ১০ লাখের বেশি থাকলেও তার বড় অংশ বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে হয়েছে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান এক্সচেঞ্জ চালু, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র সমপ্রসারণ এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জনশক্তি গড়ে তোলার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি সেই বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ, সনদায়ন এবং চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে বোয়েসেলের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরো বেশি দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিদেশে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি দক্ষ কর্মী রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয়ও আরো টেকসই ভিত্তি পাবে।
জানতে চাইলে বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. শওকত আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘দেশে জনশক্তির অভাব নেই। তবে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে সেই জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ কারণে দক্ষ কর্মী তৈরির পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক। আমরা শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর থাকতে চাই না; ইউরোপের পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বাজারেও বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছি।’

