বিশেষ টিকার বাইরে থাকা শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে হামে

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২০

ঢাকা শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের ২ নম্বর হাম ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে রয়েছে ৩০টি বেড। সবগুলো বেডেই হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। তবে এই ৩০টি বেডে ভর্তি থাকা শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কেউই হামের বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনের আওতায় আসেনি। কেউ বলছেন, তারা জানতেন না, কেউ বলছেন, ছয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হচ্ছে—সেটা জানা ছিল না। চিকিৎসকেরাও বলছেন, এখন যারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে তারা আসলে টিকার আওতায় আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা দেওয়ার আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও, এখনো হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু।

৪ নম্বর বেডে আছে চার বছর ছয় মাসের শিশু নুসরাত জাহান, বরিশালের ভোলা থেকে শিশুকে নিয়ে এসেছেন মা বিনা বেগম। তিনি জানান, মোয়ের জ্বর, র‌্যাশ দেখা দিলে চরফ্যাশনে প্রাইভেট ডাক্তার দেখাই। তিনি বলেন, হাম হয়েছে, আমরা তখন বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। একই বিছানায় শুয়ে আছে, অসুস্থ শিশুটির ছোট বোন নুসায়বা জাহান। যার বয়স দুই বছর চার মাস। তবে তারা দুই বোনের একজনও টিকা পায়নি। শিশুদের মা বলেন, নতুন করে টিকা দিয়েছে, সেই মাইকিং আমরা শুনিই নাই। আগে তো টিকা দিলে মাইকিং করে বলে দিত।             

জানা গেছে, হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দেশে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয় শিশুদের বিশেষ টিকাদান  ক্যাম্পেইন, যা শেষ হয় ২০ মে। স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করছিল, টিকাদানের এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল এখনো রয়ে গেছে।

চলতি বছর ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর গণনা সরকারিভাবে শুরু হয়। সেই হিসেবে গত সাড়ে চার মাসে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৮৪০ শিশুর। বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই ঢাকা শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, টিকার বাইরে থাকা শিশুরাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না তাদের মৃত্যু হচ্ছে। অনেককে আবার দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো লক্ষ্যভিত্তিক সব শিশুকে টিকার আওতায় না আনা। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে সরকারের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। তবে বাস্তবে ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা সংক্রমণ অব্যাহত থাকার একটি বড় কারণ।

সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় রুটিন টিকা কার্যক্রমে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দেশব্যাপী হাম প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের হাম-রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করে।

সরকারি হিসাবে ২ মাস ১০ দিন আগে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ১০৩ শতাংশ টিকা দেওয়া হলেও আক্রান্ত ও মৃত্যু থামছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যু প্রতিরোধে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন চালানো হলেও যথাযথ মাইক্রোপ্ল্যানিং না হওয়ায় তেমন কাজে আসেনি ঐ কর্মসূচি। ফলে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু এখনো চলছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, হাম একদম শেষ হয়ে যায়নি, এখনো আছে তবে তা কম। আউটডোরেও ভিড় কমেছে। হাম-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে আসছে সবচেয়ে বেশি রোগী। এর মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা অন্যতম। এই নিউমোনিয়ায় মারাও গেছে সবচেয়ে বেশি শিশু।

জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী ইত্তেফাককে বলেন, এই সরকার ছয় মাস সময় পেয়েছে, এখনো কেন বাচ্চারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে? এখন যারা হাম নিয়ে হাসপাতালে আসছে তারা কেউ টিকা পায়নি। এখন কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অজুহাত দিলে চলবে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

ইত্তেফাক/এমএস