প্রশাসকের ওপর হামলার পর কারখানার রাস্তা কেটে দিল সিটি করপোরেশন

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ২২:৪২

রাজধানীর উত্তরখানে একটি কারখানায় যাওয়ার সড়ক কেটে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কারখানাটির সামনে ময়লা ফেলা নিয়ে বিরোধের জেরে গতকাল রোববার ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের ওপর হামলার ঘটনার পর মধ্যরাতে এই সড়ক কাটা হয়।

সিটি করপোরেশন বলছে, সেখানে দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় নালা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে কারখানার কর্মীদের অভিযোগ, মালিকপক্ষকে ভোগান্তিতে ফেলতেই রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে।

উত্তরখানের যে কারখানাটিকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ, সেটির নাম নেপচুন অ্যাকসেসরিজ সলিউশন। রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার জন্য বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। রোববারের ঘটনার পর থেকে কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।

সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনের সড়কটি কেটে ফেলা হয়েছে। খনন করে তোলা মাটি রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কারখানার ভেতরে দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন কর্মী দাবি করেন, মালিকপক্ষের দুর্ভোগ বাড়াতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৮-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা বলেন, ওই স্থানে পানি নিষ্কাশনের জন্য অনেক দিন ধরেই একটি নালা নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে কাজটি করা সম্ভব হচ্ছিল না। তার ভাষ্য, আগেরদিনের ঘটনার পর কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সড়ক কেটে নালা নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সড়কটি আবার মেরামত করা হবে বলেও জানান তিনি।

ময়লা ফেলা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত কারখানার সামনের একটি অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রকে ঘিরে। নেপচুন অ্যাকসেসরিজ সলিউশন ঢাকা উত্তর সিটির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় অবস্থিত। কারখানাটির সামনেই ২০২৩ সালে উত্তর সিটি করপোরেশন একটি অস্থায়ী সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করে। কারখানায় প্রবেশের একমাত্র সড়কটি এই এসটিএসের পাশ দিয়েই গেছে।

কারখানার কর্মীদের ভাষ্য, এসটিএসে রাখা ময়লার দুর্গন্ধের কারণে ভেতরে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি বিদেশি ক্রেতারাও এ নিয়ে আপত্তি তোলে। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ালে কারখানা কর্তৃপক্ষ ওই এসটিএসে ময়লা রাখার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পায়।

কারখানার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি ছবি দেখান। ওই ছবিতে এসটিএসের সামনে টাঙানো একটি ব্যানারে উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী উত্তরখান মৌজার রাজাবাড়ী গণকবরস্থানের পাশের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের সংস্কার ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা লেখা ছিল। তবে আজ গিয়ে ওই ব্যানার দেখা যায়নি।

কারখানার গ্রাফিকস বিভাগের এক কর্মীর দাবি, আদালতের নির্দেশনার পর এসটিএসের ভেতরে ময়লা না ফেলে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে কারখানার সামনের সড়কেই ময়লা জমা করতে শুরু করেন। এতে একদিকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, অন্যদিকে কারখানায় যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছিল। বহুবার আপত্তি জানিয়েও কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ তার।

কারখানার সামনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ওপরই ময়লার স্তূপ ফেলা হচ্ছে। বেলা আড়াইটার দিকে আরও দুটি পিকআপ ও ইঞ্জিনচালিত দুটি ভটভটি থেকে রাস্তার ওপর ময়লা ফেলতে দেখা যায়। এতে কারখানার প্রবেশপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এসটিএসের কর্মী হাসমত আলী বলেন, আদালতের আদেশের কারণে এসটিএসের ভেতরে ময়লা ফেলা যাচ্ছে না। তাই আপাতত সরকারি সড়কের অংশে ময়লা রাখা হচ্ছে। পরে রাতের বেলায় ডাম্প ট্রাকে করে সেগুলো আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সিটি করপোরেশন, কারখানা ও পুলিশ সূত্র জানায়, রোববার সকালেও কারখানার সামনের সড়কে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ময়লা ফেলছিলেন। এ সময় কারখানার একজন ব্যবস্থাপক ওই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাকে বাধা দেন। এ নিয়ে প্রথমে বাগ্‌বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা অন্য শ্রমিকদের ডাকেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনার পর বিকেলে পরিস্থিতি দেখতে সেখানে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এবং ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। তাদের সঙ্গে স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও ছিলেন। প্রশাসক ও সংসদ সদস্য যখন কারখানার মালিকপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন, তখন নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।

কারখানার কর্মীদের দাবি, সে সময় কারখানার মালিককে হেনস্তা করা হচ্ছিল। খবর পেয়ে শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে রক্ষা করেন। অন্যদিকে ডিএনসিসির দাবি, প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। রোববার সিটি করপোরেশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে মালিকপক্ষের ‘ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা’ অতর্কিতে প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর হামলা চালায়।

উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় ডিএনসিসি বাদী হয়ে মামলা করেছে। এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মধ্যরাতে রাস্তা কাটার অভিযোগ
প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর রাতেই কারখানার সামনের সড়ক কেটে ফেলা হয়। পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের দুই শ্রমিক বলেন, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে সিটি করপোরেশনের একটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে সড়কটি কাটা হয়েছে।

রাজধানীতে আধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৩ সালে। তবে জমি অধিগ্রহণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তির কারণে কাজের গতি ধীর ছিল। ২০১৫ সালে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে আনিসুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পর এসটিএস নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ গতি পায়। ২০১৬ সালে উত্তর সিটিতে ৩৯টি এসটিএস চালু ছিল এবং আরও ৯টির নির্মাণ চলছিল।

এসটিএসে মূলত বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ময়লা-আবর্জনা অস্থায়ীভাবে রাখা হয়। পরে ডাম্প ট্রাক, কনটেইনার ক্যারিয়ার বা কম্পেক্টরের মাধ্যমে ওই বর্জ্য স্থায়ী স্থানান্তরকেন্দ্র বা ল্যান্ডফিলে নেওয়া হয়। ঢাকার দুই সিটির জন্য উত্তরে আমিনবাজারে এবং দক্ষিণে মাতুয়াইলে ল্যান্ডফিল রয়েছে।

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পিতভাবে এসটিএস স্থাপন না হওয়ায় সিটি করপোরেশন বিকল্প জায়গা বেছে নিয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর প্রভাব ও উপযোগিতা যাচাই করা হয়নি। তার মতে, রাজউকের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে আগেই উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা উচিত ছিল। প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণ করে হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এসটিএস স্থাপন করতে হবে, যাতে স্থানীয় বিরোধ ও জনভোগান্তি এড়ানো যায়।

 

সূত্র: প্রথম আলো

ইত্তেফাক/এনএন