উপকূলবর্তী কচা নদীর তীরের জনপদ ভাণ্ডারিয়ায় গ্যাসের নতুন ক্ষেত্র পাওয়া গেছে। ভোলার শাহবাজপুরের পর পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা হতে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের গ্যাসের নতুন উত্স। এই উপজেলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র থাকার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা।
ভাণ্ডারিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে অগভীর নলকূপ দিয়েও গ্যাস উদগিরণ হচ্ছে। ভূগর্ভের অগভীর অংশ থেকে গ্যাস বের হওয়া এবং তেল গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত একমাত্র রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিপুল উদ্যম তৈরি হয়েছে। গ্যাসক্ষেত্রের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হলে শিল্প উত্পাদন বাড়ার পাশাপাশি দ্রুত নতুন কর্মসংস্থান হবে।
বাপেক্স সূত্র জানায়, দেশব্যাপী বিদ্যমান গ্যাস সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে স্থলভাগের তিনটি ব্লকে দ্বিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। বাপেক্স এবং চীনা কোম্পানি সিনোপ্যাক যৌথভাবে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল এবং পিরোজপুর জুড়ে প্রায় ৪ হাজার লাইন কিলোমিটার ভূকম্প জরিপ সম্পন্ন করেছে। ওই জরিপে ভাণ্ডারিয়া এলাকায় গ্যাসের নতুন উেসর তথ্য পাওয়া গেছে। এখন কিছু কারিগরি বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা বাকি। এ প্রস্তুতিশেষে কয়েক মাসের গ্যাসক্ষেত্রের ব্যাপারে ঘোষণা দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ও বাপেক্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মঈনুল হোসেন বলেন, গত বছরের এপ্রিল থেকে এই গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংগৃহীত তথ্যের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ এবং নির্ধারিত স্থানে খননশেষে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বাপেক্সের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ভোলা ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাসক্ষেত্রের প্রমাণিত উপস্থিতি এতদিন পাওয়া যায়নি। তবে এখন সুন্দরবনের নিকটবর্তী, পদ্মা নদীর তীরবর্তী এবং বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী এলাকায় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভাণ্ডারিয়ায় বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী এলাকায় সম্প্রতি পরিচালিত জরিপ ইতিবাচক।
অনুসন্ধানকারী দলের এক সদস্য জানান, ভাণ্ডারিয়া পয়েন্টে ভূপৃষ্ঠের গভীরতা, ক্যানেল, লেয়ার পর্যালোচনায় গ্যাস থাকার প্রমাণ পেয়েছেন চীনা প্রকৌশলীরা। এক্ষেত্রে প্রোম্যাক্স টুডি, জিওক্লাস্টার এবং জিওভ্যাশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ভূ-গঠন পর্যালোচনায়ও গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এ প্রেক্ষাপটে গত বুধবার থেকে ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ইকড়ি ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মো. দেলোয়ার হোসেনের বাড়ির একটি অগভীর নলকূপ থেকে গ্যাস উদগিরণ হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দেলোয়ার হোসেন জানান, বুধবার মাটির ৪৫ ফুট গভীরে গিয়ে পানির লেয়ার পাওয়ায় পাইপ বসানো শেষ হয়। এরপর পাইপ থেকে পানি ওঠতে থাকে। সিগারেটের আগুন পানিতে পড়লেই আগুন জ্বলে ওঠে। তখন মিস্ত্রিরা একটি ভেজা কাঁথা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে নলকূপের মুখ বন্ধ করে দেন।
ওই গ্রামের বাসিন্দা আলম গাজী জানান, ৩ বছর আগে একই এলাকার মাওলানা খলিলুর রহমানের বাড়িতেও একটি নলকূপ থেকে একইভাবে গ্যাস বের হলে তিনি সেটি ভয়ে বন্ধ করে দেন। ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জেলা পরিষদের সদস্য আব্দুল হাই হাওলাদার ইত্তেফাককে জানান, এর আগেও একই এলাকার একটি বাড়িতে টিউবয়েল বসানোর পর একইভাবে গ্যাস বের হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ইউনিয়নে গ্যাসের খনি রয়েছে।
ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহীন আক্তার সুমী বলেন, ভাণ্ডারিয়ার ইকড়িতে একটি অগভীর নলকূপ থেকে গ্যাস উঠছে। ভৌগোলিক দিক থেকে বিবেচনা করলে কঁচা নদী সংলগ্ন এলাকায় গ্যাসের সন্ধান পাওয়া- ভাণ্ডারিয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের জন্য একটি সুসংবাদ। গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হলে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। বাসাবাড়িতে বেশি মূল্যে গ্যাস কিনতে হবে না। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল তালুকদার বলেন, ভাণ্ডারিয়ায় গ্যাসের সন্ধান মিলায় নতুন আশা ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। এ গ্যাস যদি সঠিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হয় তাহলে এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনসহ অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
