জুলাই গণঅভ্যুত্থান

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগের ৭২ ঘণ্টার পরিস্থিতি

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫২

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে টানা ৭২ ঘণ্টায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

২ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশজুড়ে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই দিন আন্দোলনের সমন্বয়করা জানান, ঢাকার ডিবি কার্যালয়ে চাপ দিয়ে তাদের আগের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল।

এদিনই আন্দোলনকারীরা ৩ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের বিচার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে ঢাকায় ‘দ্রোহ যাত্রা’ কর্মসূচি পালিত হয়। দুপুর থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য ফেসবুক ও টেলিগ্রাম বন্ধ রাখা হয়।

৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ সরকারের কোনোভাবেই আর এক মিনিট ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করলেই হবে না; বরং খুন, লুটপাট, দুর্নীতি এদেশে হয়েছে তার বিচার হতে হবে। আমরা পদত্যাগ দিয়ে তাকে এক্সিট রুট দিতে চাই না। তাকে পদত্যাগও করতে হবে, বিচারের আওতায়ও আনতে হবে।’

একই দিন আন্দোলনকারীরা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়, যা প্রথমে ৬ আগস্ট নির্ধারণ করা হলেও পরে একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট করা হয়।

সরকারের সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফেসবুকে লেখেন, ‘গুলি আর সন্ত্রাসের সাথে কোনো সংলাপ হয় না।’ অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম টেলিগ্রামে বলেন, ‘সরকারের কাছে বিচার চাওয়া বা সংলাপে বসারও সুযোগ আর নেই। ক্ষমা চাওয়ার সময়ও পার হয়ে গেছে।’

৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সরকারি নির্দেশে মোবাইলের ফোর-জি ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। সহিংসতায় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক মানুষ নিহত হন। এদিন সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে।

একই দিনে শাহবাগ থেকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের সমন্বয়করা দেশজুড়ে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ ঢাকার দিকে আসতে শুরু করেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জনতার ঢল নামে। পরে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। বিকেলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। আমরা এখন রাষ্ট্রপতির কাছে যাবো, সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করবো। আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।’

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশ করেন। একই দিন রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দল, তিন বাহিনীর প্রধান ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি জানান, অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে এবং সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় ৮০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সহিংসতার মধ্য দিয়েই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার টানা শাসনের অবসান ঘটে।

সূত্র: বিবিসি 

 
ইত্তেফাক/এসজে