নারীদের জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ কি বৈধ?

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১৩

কোনো মুসলমানের জানাজায় অংশগ্রহণ ও তাকে কবরস্থ করা সমাজের মুসলমানদের ইমানি দায়িত্ব। একইসঙ্গে এতে রয়েছে অধিক পরিমাণে সওয়াব। এছাড়া এটি এক মুমিনের ওপর অন্য মুমিনের অধিকার। হাদিসে জানাজায় অংশগ্রহণের বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ রয়েছে। 

তবে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, নারীরা কি জানাজায় অংশ নিতে পারবেন? এ বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী—তা নিয়েই আলোচনা

মূলত কুরআন সুন্নাহর প্রতিটি বিধান নারী-পুরুষ সবার জন্যই সমান। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাসআলায় ভিন্নতা আছে। ভিন্নতাগুলো হাদিসে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ থাকতে হবে। তা না হলে পুরুষের জন্য যা প্রযোজ্য নারীর জন্যও তা প্রযোজ্য। ইসলামি ফিকহের এটি একটি মৌল নীতি। এই নীতির আলোকেই আমাদের এ বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। জানাজার নামাজের যে ফজিলত হাদিসে রয়েছে সেখানে নারী-পুরুষ কোনো পার্থক্য করা হয়নি। কাজেই একজন পুরুষ যেমন জানাজার নামাজ পড়ে সাওয়াব লাভ করতে পারে একজন নারীও পারে সাওয়াব লাভ করতে। কিন্তু এখানে একটি কথা আছে। এটা শুধু জানাজার নামাজের কথা নয়। অন্যান্য নামাজের ক্ষেত্রেও একই কথা।

পাঁচ ওয়াক্ত জামাতের নামাজ, জুমার নামাজ এবং ঈদের নামজেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য। মেয়েরা কি এসব জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে? এক্ষেত্রে কথা হচ্ছে, পুরুষের জন্য জামাতে অংশগ্রহণ করা আবশ্যক। পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে অংশগ্রহণ করা পুরুষের জন্য ওয়াজিব। নারীর জন্য ওয়াজিব নয়। নারী তার ঘরে নামাজ পড়লেও সমান সাওয়াব লাভ করতে পারবে। এ বিষয়ে কোনো মতানৈক্য নেই। নারীদের প্রতি সহজতার জন্যই ইসলামে এই বিধান দেওয়া হয়েছে। নারীদের জামাতে হাজির হওয়া আবশ্যক করা হলে তা তাদের জন্য কষ্টকর হতো।

জানাজার ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (সা.) জানাজায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন। একটি হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজা আদায় করবে, সে এক ‘কিরাত’ পরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি জানাজা আদায়ের পাশাপাশি দাফনকার্যেও অংশ নেবে, তার জন্য থাকবে দুই ‘কিরাত’ সওয়াব।

এক সাহাবি জানতে চাইলে, ‘দুই কিরাত বলতে কী বোঝায়?’ জবাবে মহানবী (সা.) বলেন, ‘দুই কিরাতের ক্ষুদ্রতম কিরাত ওহুদ পাহাড়ের সমান।’ (ইবনে কাছির)

আমাদের সমাজে প্রচলিত চিত্র

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অনেক অঞ্চলে সাধারণত পুরুষরাই জানাজায় অংশ নেন। নারীদের জানাজায় উপস্থিত হতে খুব কমই দেখা যায়। এর ফলে অনেকেই মনে করেন, নারীদের জন্য জানাজা আদায় করা বৈধ নয়। কিন্তু ইসলামি ফিকহের আলোচনায় বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ফিকহবিদ আলেমদের মতে, নারীদের জানাজা আদায়ে শরিয়তের পক্ষ থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। হারাম শরিফ, মসজিদ কিংবা অন্য যেকোনো স্থানে জানাজা অনুষ্ঠিত হলে নারীরা চাইলে তাতে অংশ নিতে পারবেন। এ বিষয়ে ইসলামি আইনবিদদের মধ্যে মৌলিক কোনো মতভেদ নেই।

অর্থাৎ, শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীদের জানাজা আদায় করা বৈধ।

মহিলারা জানাজার নামাজ পড়তে পারবে কি?

এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের অন্যতম হক হলো সে তার জানাজার নামাজ আদায় করবে, তাকে সমাহিত করবে। রাসুল (সা.) বলেন,

حَقُّ المُسْلِمِ عَلَى المُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلاَمِ، وَعِيَادَةُ المَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ العَاطِسِ
এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের হক পাঁচটি: সালামের জবাব দেওয়া, অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, তার জানাজায় যাওয়া, দাওয়াত কবুল করা এবং তার হাঁচির জবাব দেওয়া। (সহিহ বুখারি: ১২৪০, সহিহ মুসলিম: ২১৬২)

মুসলমান মৃতের জন্য জানাজা পড়া ফরজে কেফায়া বা মুসলমান সমাজের আবশ্যকীয় কর্তব্য অর্থাৎ কয়েকজন জানাজা পড়লে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে, কেউ না পড়লে সবাই গুনাহগার হবে।

জানাজার নামাজ আদায়ের মূল দায়িত্ব পুরুষদের ওপর বর্তায়। তবে জানাজার নামাজ যদি মসজিদে বা বাড়িতে হয়, পর্দহীনতা, বিলাপ, আহাজারির মতো শরিয়তবিরোধী কিছু ঘটার আশংকা না থাকে, তাহলে অন্য সব নামাজের মতো নারীদের জন্য জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করাও বৈধ।

কোন বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে হবে?

আলেমরা বলেছেন, নারীরা জানাজায় অংশ নিলেও সেখানে পর্দার বিধান, নিরাপত্তা এবং শরিয়তসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। যদি পর্দাহীনতা, নিরাপত্তার ঝুঁকি বা শরিয়তবিরোধী কোনো পরিস্থিতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

এ কারণেই অনেক আলেম সামাজিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নারীদের জানাজায় অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করে থাকেন। তবে এটি জানাজার বৈধতা অস্বীকার করার কারণে নয়; বরং সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে।

কবরস্থানে যাওয়ার বিষয়ে কী বলা হয়েছে?

আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নারীরা জানাজা আদায় করতে পারলেও জানাজার সঙ্গে চলাচলা বা ঘন ঘন কবরস্থানে যাওয়া মাকরূহ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তাই শরিয়তের আলোকে নারীদের জানাজায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও জানাজার সঙ্গে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া কিংবা নিয়মিত কবর জিয়ারতের ক্ষেত্রে সংযম ও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সার্বিকভাবে ইসলামি শরিয়তের আলোকে বলা যায়, নারীদের জানাজা আদায়ে কোনো নিষেধ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে পর্দা, নিরাপত্তা এবং শরিয়তের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
 

 

ইত্তেফাক/এনটিএম