নামাজ হলো মুমিনের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে নিজেকে সমর্পণের সবচেয়ে পবিত্র মাধ্যম। নামাজের প্রতিটি রোকন ও শর্ত যথাযথভাবে পালন করাই ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই নামাজে শরীর ঢাকার অর্থাৎ ‘সতর’ ঢেকে রাখার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের নামাজে সতরের সীমানা কতটুকু এবং ভুলবশত শরীরের কোনো অংশ অনাবৃত হয়ে গেলে নামাজের বিধান কী হবে—এ নিয়ে অনেকেই সংশয়ে থাকেন। এ বিষয়ে ফিকহ ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো—
নারীদের নামাজে সতরের সীমা ও পায়ের পাতার বিধান
নামাজ আদায়ের সময় নারীদের জন্য চেহারা, কবজি পর্যন্ত দুই হাত এবং টাখনু পর্যন্ত পায়ের অংশ অনাবৃত রাখার অনুমতি রয়েছে। এগুলো ছাড়া শরীরের বাকি অংশ ঢেকে রাখা ফরজ। সে হিসেবে নামাজের সময় নারীদের পায়ের পাতা ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক বা জরুরি নয়, তবে পায়ের টাখনু বা গিরা ঢেকে রাখা জরুরি।
সতর অনাবৃত হওয়ার পরিমাপ ও নামাজ ভঙ্গের শর্ত
নামাজে যে অঙ্গগুলো ঢেকে রাখা ফরজ, সেগুলোর কোনো একটি অঙ্গের চার ভাগের এক ভাগ (এক-চতুর্থাংশ) বা তার বেশি অংশ যদি তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় (অর্থাৎ তিনবার ‘সুবহানা রব্বিয়াল আজিম’ বলতে যে সময় লাগে) খোলা থাকে, তবে নামাজ নষ্ট হয়ে যায়।
কানের অংশ: নামাজের সময় যেকোনো একটি কানের চার ভাগের এক ভাগ অংশ যদি টানা তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় খোলা থাকে, তবে নামাজ ফাসিদ বা নষ্ট হয়ে যাবে।
টাখনু ও পায়ের নলা: নারীদের টাখনু সতরের অন্তর্ভুক্ত। ফিকহের বিধান অনুযায়ী পায়ের নলা ও টাখনু মিলে একটি অঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়। এই অঙ্গের চার ভাগের এক ভাগ অংশ যদি তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় অনাবৃত থাকে, তবে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। তবে কেবল টাখনু খোলা থাকলে নামাজ মাকরুহ হলেও তা আদায় হয়ে যাবে।
মাথার চুল: নামাজের সময় নারীদের চুল ঢেকে রাখা আবশ্যিক। মাথার সব চুল মিলিয়ে একটি অঙ্গ ধরা হয়। পুরো চুলের চার ভাগের এক ভাগ বা তার বেশি অংশ যদি তিন তাসবিহ সময় খোলা থাকে, তবে নামাজ ভাঙার কারণ হবে। অবশ্য এক-চতুর্থাংশের কম সময় বা অংশ খোলা থাকলে নামাজ নষ্ট হয় না। তা সত্ত্বেও পূর্ণ সতর্কতার জন্য পুরো মাথা ও চুল ভালোভাবে কাপড় বা হিজাব দিয়ে ঢেকে নেওয়া কর্তব্য।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে নারীদের পোশাকের বিধান
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নারীদের পর্দার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে বলেন—
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ
‘আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সচরাচর প্রকাশ পেয়ে থাকে তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
নামাজে নারীদের পোশাক কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে হাদিস শরীফে স্পষ্ট বার্তা এসেছে। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ صَلاَةَ حَائِضٍ إِلاَّ بِخِمَارٍ
‘আল্লাহ তাআলা কোনো প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নামাজ ওড়না (বা মাথা-শরীর ভালোভাবে ঢাকার কাপড়) ছাড়া কবুল করেন না।’ (আবু দাউদ ৬৪১, তিরমিজি ৩৭৭)
অতএব, নামাজের সময় নারীদের সতর্কতার সঙ্গে সতর ঢেকে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পায়ের পাতা খোলা থাকলেও নামাজ আদায় হয়ে যায়, তবে টাখনু, চুল ও অন্যান্য ফরজ অঙ্গ যেন সঠিক নিয়মে ঢাকা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা চাই। সামান্য অসাবধানতায় যেন আমাদের কাঙ্ক্ষিত ইবাদতটি নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সচেতন হওয়াই মুমিনের পরিচয়।

