প্রাক্তনের স্মৃতি মনে আসা একটি সাধারণ ব্যাপার। এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক এবং আবেগিক কিছু কারণ। পুরোনো অভ্যাস, নস্টালজিয়া, অসম্পূর্ণতাবোধ বা বর্তমানের কোনো শূন্যতা প্রাক্তনের স্মৃতিকে বারবার জাগিয়ে তোলে। মস্তিষ্ক পুরোনো প্যাটার্ন অনুসরণ করতে পছন্দ করে। আর তাই চেনা সম্পর্কগুলোর স্মৃতি সহজে পিছু ছাড়তে চায় না।
প্রাক্তনের কথা ভেবে মন খারাপ করাও অস্বাভাবিক নয়। গভীর রাতে চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে ওঠে প্রাক্তনের মুখ, পুরোনো কথোপকথন কিংবা একসঙ্গে কাটানো কিছু মুহূর্ত। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেও আসে না ঘুম। এমন অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের আবেগে আটকে থাকলে তা শুধু মানসিক শান্তিই নয়, ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দও নষ্ট করতে পারে।
সবকিছুতে পূর্ণ থাকলেও গভীর রাতে মনে পড়ে যায় প্রাক্তনকেই। এতে কোনো অপরাধ নেই। কিন্তু জানেন কেন হয় এরকম? চলুন জেনে নিই—
১. মানুষ অভ্যেসের দাস। একটা গতে বাধা জীবনে বিশ্বাসী। যা যেভাবে ছিল, তা বদলে গেলে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। গতকালও যে ছিল, আজ সে নেই, এটা মেনে নিতে পারাই চ্যালেঞ্জ। মানতে না পারলেই ঘুরে ফিরে আসে স্মৃতি।
২. ভালোবাসার মিষ্টি অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে ‘ফিল-গুড’ রাসায়নিকের নিঃসরণ করে। ফলে আমাদের মন-মেজাজ থাকে ফুরফুরে। বিচ্ছেদে এই অনুভূতিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সেই কারণে মন চায় সেই পুরোনো জীবন ফিরে পেতে।
৩. অনেক সময় ‘ক্লোজার’ ছাড়াই বিচ্ছেদ হয়ে যায়। অনেক প্রশ্ন থেকে যায় অজানা। এক্ষেত্রে প্রাক্তনকে মনে পড়া খুব স্বাভাবিক। রাগ, দুঃখ, অভিমানের পাশাপাশি মাঝে মধ্যেই মনে উঁকি মারে প্রশ্ন, ‘কোন দোষে এই দূরত্ব?’ জবাব মেলে না। কিন্তু একথাই বারবার মনে করিয়ে দেয় পুরোনো সুন্দর দিনগুলো।
কেন আসে না ঘুম?
মানসিক চাপ ও আবেগের কারণে শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে শরীর বিশ্রাম নিতে চাইলেও মস্তিষ্ক সচল থাকে। অনেকেই ঘুমানোর আগে পুরোনো ছবি দেখা, পুরোনো চ্যাট পড়া বা প্রাক্তনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘাঁটার অভ্যাসে আরও বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এতে ঘুম আরও দেরিতে আসে এবং ঘুমের মানও কমে যায়।
এর প্রভাব কী?
* সকালে ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভব করা।
* কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া।
* খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক অস্থিরতা।
* দীর্ঘদিন চলতে থাকলে উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
* রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতা ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বের হবেন?
নিজেকে সময় দিন:
বেশ কিছু স্মৃতি হৃদয়ের গহীনে বাসা বাঁধে। এসব স্মৃতি ভুলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবুও যতটা দিন সম্পর্কে ছিলেন, তার মনের মতো হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এবার নিজেকে বদলে ফেলুন, নিজেকে সময় দিতে শিখুন। নিজের জন্য আলাদা করে কিছু একান্ত সময় রাখুন। এতে করে ভুলে যাওয়া সহজ হবে।
অতীত ঝেড়ে ফেলুন:
যা এখন আমার নয়, তা নিয়ে চিন্তা করা নিতান্তই বোকামি। পুরনো স্মৃতি মনে করে চোখের পানি ফেলা একদমই বোকামি। নিজে স্বাভাবিকভাবে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
আনন্দ নিয়ে বাঁচুন:
সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পিছনে অবশ্যই কোনো না কোনো কারণ ছিল। তাই নিজেকে অযথা অপরাধী মনে করবেন না। নিজেকে বদলে আনন্দ নিয়ে বাঁচুন।
পছন্দের কাজ করুন:
যে কাজগুলোয় আপনার মন থাকবে, সেই কাজগুলোয় ভরসা রাখুন। গান শুনুন, বই পড়ুন, ছবি আঁকুন, খেলাধুলা করুন, সিনেমা দেখতে বা বেড়াতে যেতে পারেন। এতে প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়া অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।
মনোবিদের পরামর্শ নিন:
সকলের মনে জোর একই রকমের নয়। নিজেকে সামলে নিতে মনোবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। সাইকোলজিস্টের থেরাপির মাধ্যমে দ্রুতই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব না হলেও, তাকে জীবনের একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে শান্তির ঘুম ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

