চট্টগ্রাম ছাড়া সব বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ, নভেম্বরে একসঙ্গে ফল

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২০:২১

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা বাদে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমানের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন, প্রশ্নপত্রে ভুল-অসংগতি এবং বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশাসনিক ত্রুটির মতো নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে শনিবার শেষ হয় অধিকাংশ বোর্ডের পরীক্ষা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্থগিত পরীক্ষাগুলো শেষ হবে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর।

সব বোর্ডের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমা দ্বিতীয় পত্র, শিশু বিকাশ দ্বিতীয় পত্র এবং বিকেলে সমাজবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, সমাজকর্ম দ্বিতীয় পত্র ও ক্রীড়া দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিমের উচ্চতর গণিত দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ভোকেশনাল ও বিএমটির তত্ত্বীয় পরীক্ষা আগেই শেষ হয়েছে।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২ জুলাই। এতে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছেন। এবার সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চট্টগ্রামের পরীক্ষা শেষ ৯ সেপ্টেম্বর

বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছিল। চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজার জেলার পরীক্ষা ৮ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত ছিল। এসব স্থগিত পরীক্ষা আগামী ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান শনিবার বলেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হবে। সারাদেশের ফল একসঙ্গে প্রকাশ করা হবে। তাই ওই দিন থেকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে ফল প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সে হিসাবে নভেম্বরের প্রথমার্ধে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

শুরু থেকেই বিতর্ক

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু থেকেই নানা কারণে আলোচনায় ছিল। ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের পানিতে ভিজে, নৌকা ও ভ্যান ব্যবহার করে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।

এর মধ্যেই ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পরীক্ষার পর সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ত্রুটি থাকার অভিযোগ ওঠে। পরে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়। ত্রুটি প্রমাণিত হলে পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার কথা জানানো হয়।

এ ঘটনায় সিলেট শিক্ষা বোর্ড প্রশ্নপ্রণেতা ও মডারেটরসহ চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।

এরপর ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত রসায়ন প্রথম পত্রের বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের প্রশ্নে অসংগতি থাকার অভিযোগ ওঠে। পরীক্ষার্থীদের একাংশ দাবি করেন, একটি সৃজনশীল প্রশ্ন দুই সংস্করণে এক ছিল না।

২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের ইংরেজি সংস্করণের তিনটি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নেও অসংগতি থাকার অভিযোগ ওঠে।

ভুল প্রশ্নে বিপাকে পরীক্ষার্থীরা

শুধু প্রশ্নপত্রে ভুল নয়, বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশাসনিক ত্রুটির ঘটনাও ঘটেছে। ১ আগস্ট টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজ কেন্দ্রে মনোবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। পরীক্ষা শেষে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের নজরে আসে। এ ঘটনায় কেন্দ্রসচিবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

এর আগে ৩০ জুলাই রাজধানীর মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি কলেজ কেন্দ্রে মনোবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষায় ভুল সেটের প্রশ্নপত্র দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই কেন্দ্রে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

১৬ জুলাই সাতক্ষীরা সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভূগোল প্রথম পত্রের পরিবর্তে ভুলবশত দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণের অভিযোগ ওঠে। পরীক্ষা শুরুর প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর বিষয়টি ধরা পড়লে প্রশ্নপত্রগুলো ফিরিয়ে নিয়ে সঠিক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এ ছাড়া ৪ জুলাই বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় সরকারি আহম্মদ মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রের একটি কক্ষে পরীক্ষার্থীদের ভুলবশত আগের বছরের পাঠ্যসূচিভিত্তিক প্রশ্নপত্র দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে তদন্তে প্রশাসনিক অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়।

খাতা মূল্যায়নেও অনিয়মের অভিযোগ

এবারের পরীক্ষায় উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি বিএমটি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মো. রিপন হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ওই প্রতিষ্ঠানের একাদশ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে বসে এইচএসসি পরীক্ষার এমসিকিউ উত্তরপত্রের খালি ঘর পূরণ করতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের বলতে শোনা যায়, শিক্ষক রিপন হোসেন তাদের উত্তরপত্রের খালি ঘর পূরণ করতে বলেছেন।

বিষয়টি নজরে আসার পর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবহেলার অভিযোগে ৩ আগস্ট ওই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

নানা বিতর্ক ও প্রশাসনিক ত্রুটির মধ্যেও চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য বোর্ডের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

ইত্তেফাক/এমএএম