আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৮

জাহিদ হাসান 

গোটা পৃথিবীতে প্রাণিজগতের অর্ধেকের বেশিই বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। মজার ব্যাপার হলো, এসব পোকামাকড়ের প্রায় ৯৯ শতাংশই উপকারী। মৌমাছি ও রেশম পোকার মতো উপকারী পোকামাকড় চাষ করে বাংলাদেশের ন্যায় এখন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশ। বাকি  সেই ১ শতাংশ অপকারী পোকামাকড়ের একটি হলো এডিস মশা, যা আমাদের দেশে এখন হয়ে উঠেছে এক আতঙ্কের নাম। জানা যায়, ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুর দেখা মেলে ১৯৬৪ সালে। তখন এই মশার দ্বারা সৃষ্ট অসুখের নাম ছিল ঢাকা ফিভার। ২০০০ সালে এটির মাত্রা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। তারপর থেকে প্রতিবছরই কমবেশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। তবে এ বছর এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এডিস এলবোপিকটাস ও এডিস ইজিপটাই—দুই ধরনের এডিস মশাই এই ডেঙ্গু রোগের কারণ। তবে এর মধ্যে প্রথম প্রজাতিটিই প্রধান বাহক। ৯৫ শতাংশ ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে এটি। এডিস মশার ডিম ছয় মাস পর্যন্ত শুকনো অবস্থায় ভালো থাকে। এবার ডেঙ্গুর এমন প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ, ১৯৫৩ সালের পর এ বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে এত বেশি বৃষ্টি হয়েছে। তাই পানি পেয়ে শুকনো ডিমগুলো এবার আগেভাগেই বংশবিস্তার করেছে। তাই শুধু কোনো নির্দিষ্ট সময়ই নয়, সারা বছরই চারপাশ পরিষ্কার রাখা, ঘরের কোথাও পানি জমতে না দেওয়া দরকার। কিন্তু রাজধানীতে বসবাসরত মানুষের মধ্যে আশপাশ পরিষ্কার রাখার মতো মনমানসিকতা কতটুকু আছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। কারণ এডিস মশার প্রকোপ বৃদ্ধির জন্য নগরবাসী একচেটিয়াভাবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকেই দায়ী করলেও আসলে কার্যক্রমটি কিন্তু সমন্বিত। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি এ কার্যক্রমে জনগণেরও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এডিস মশার বিস্তারে রাজধানীবাসীও কিন্তু দায় এড়াতে পারে না। এভাবে এটি হচ্ছে সমন্বিত একটি কার্যক্রম। আর তাই এককভাবে এ ব্যাপারে কোনো সংস্থা বা সরকারকে দায়ী করা ঠিক নয়।

গত কয়েক দিনে কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর খুব কাছ থেকেই দেখেছি। এসব মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানতে পেরেছি, এসব রোগীর স্বজনদের অধিক মাত্রায় সচেতনতার অভাব ছিল। অর্থাত্, সচেতনতার অভাবে তাদের মশা কামড়িয়েছে এমনটি নয় বরং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও মূলত তারা অসচেতন ছিল। সাধারণত আমরা জ্বর হলে প্রথম দুই-তিন দিন প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খেয়ে এবং রোগীকে গোসল করিয়ে বা মাথায় পানি ঢেলে জ্বর কমানোর চেষ্টা করি। আর জ্বরের রোগীর জন্য ডাক্তারদের পরামর্শও ঠিক এমনই থাকে। এভাবে জ্বর পাঁচ-সাত দিন অতিক্রম করলে ডাক্তাররা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবস্থাপত্র দেন। আর জ্বরের জন্য ঠিক এটিই আদর্শ চিকিত্সা পদ্ধতি।

কিন্তু এই ডেঙ্গু জ্বরের চিকিত্সা পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন হলেও দেশের জনসাধারণ এ ব্যাপারে ততটা ওয়াকিবহাল নয়, যার দরুন তারা ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রেও কালক্ষেপণের পর ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরে এই কালক্ষেপণের ফলে রোগীর প্লাটিলেট নেমে যায় প্রতিনিয়ত। ঠিক তারপরই ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মৃত রোগীর স্বজনদের অনেককেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে শুনেছি, জ্বর হওয়ার সাত-আট দিন অতিবাহিত হওয়ার পর অবস্থা বেগতিক দেখে রোগীকে তারা ক্লিনিকে ভর্তি করেছিলেন।

মোদ্দাকথা হলো, রাজধানীতে বা সারাদেশে চলমান সময়ে যে যখনই জ্বরে আক্রান্ত হন না কেন, সঙ্গে সঙ্গে ব্লাড টেস্ট করুন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। আগে জীবন বাঁচান। পরবর্তী দিনগুলোতে মশক নিধনে শুধু সরকারকে দায়ী না করে প্রতিটি পরিবার নিজ নিজ বাসার চারপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে এগিয়ে আসুন। কারণ এই পরিষ্কারের বিষয়টি অনেকাংশে দশের লাঠি একের বোঝার মতো। পরিশেষে আগত দিনগুলোতে ‘শেখ হাসিনার নির্দেশ, ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ’ কথাটি শতভাগ বাস্তবায়িত হোক এই প্রত্যাশা করছি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়