দুই বছর পরও অমীমাংসিত আর জি কর হত্যাকাণ্ড, হাসপাতালে স্মরণসভা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৯

কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নারী চিকিৎসক অভয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট রাতে হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে ৩১ বছর বয়সী ওই চিকিৎসককে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরদিন ১০ আগস্ট ভোরে হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ বিচার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এর মধ্যেই মামলার তদন্তে নতুন করে তৎপর হয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই।

ঘটনার দুই বছর পূর্তিতে আজ কলকাতায় প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে অভয়াকে স্মরণ করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বেলা ১১টায় রাজ্যের সব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। একই সঙ্গে নিহত চিকিৎসকের স্মৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। বিকেলে উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিহাটির লোকসংস্কৃতি ভবনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীসহ নিহত চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

অভয়া হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২৪ সালের ৯ আগস্টের পর কলকাতার রাজপথে নেমে আসেন হাজারো মানুষ। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি চিকিৎসকেরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। নারী চিকিৎসকের নিরাপত্তা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সেই আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ঘটনার পরদিন হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। শিয়ালদহের দায়রা আদালত ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে বিচার চলাকালে সঞ্জয় রায় বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। আদালতে তিনি বলেন, ধর্ষণ বা হত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত নন; ষড়যন্ত্র করে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।

আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি নিহত চিকিৎসকের মা-বাবা। শুরু থেকেই তাঁরা অভিযোগ করে আসছেন, তাদের মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ বিচার হয়নি। মামলাটির পুনর্তদন্তের দাবিও জানিয়ে আসছেন তারা।

এ অবস্থায় মামলাটির তদন্তে নতুন করে তৎপর হয়েছে সিবিআই। তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে নতুন কর্মকর্তা সন্দীপনী গর্গকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন তদন্ত দল মামলার নথিপত্র এবং আগের তদন্তের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছে।

নিহত চিকিৎসকের পরিবারের আইনজীবী অমর্ত্য দে অভিযোগ করেছেন, মামলায় তৎকালীন পানিহাটির তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষের ভূমিকা নিয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও আগের তদন্তে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে এবার ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

এর আগে নিহত চিকিৎসকের মা আগের তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সঠিকভাবে তদন্ত না করার অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বিজেপির সংসদ সদস্য ও সাবেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ও গত মে মাসে মামলার তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ তুলে আগের তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিলেন।

নতুন তদন্ত ঘিরে নিহত চিকিৎসকের পরিবারের প্রত্যাশা, এবার তাদের মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে এবং তারা ন্যায়বিচার পাবেন। মামলায় সিবিআইকে আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টে স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

ঘটনার দুই বছর পরও আর জি করের সেই রাত পশ্চিমবঙ্গের জনমনে গভীরভাবে আলোচিত। একদিকে ঘটনার স্মরণে সরকারি কর্মসূচি, অন্যদিকে নতুন করে তদন্তের গতি—সব মিলিয়ে এখন নিহত চিকিৎসকের পরিবার ও রাজ্যের মানুষের নজর মামলার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে।

 

ইত্তেফাক/এসএ