গবেষণা

খাদ্যবর্জ্যের কম্পোস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাড়তে পারে কৃষিজমির দূষণ

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৩৯

খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলবায়ু ও পরিবেশগত ক্ষতি কমানো সম্ভব হলেও এর সঙ্গে নতুন করে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবর্জ্য থেকে তৈরি কম্পোস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে যেতে পারে। পরে সেই কম্পোস্ট কৃষিজমিতে ব্যবহার করা হলে মাটিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

গবেষকেরা বলছেন, খাদ্য অপচয় কমানো ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহার জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগের পরিকল্পনা করার সময় প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিও শুরু থেকেই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবছর অপচয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যবর্জ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ভাগাড়ে যায়। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয়।

‘নেচার ফুড’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতির জলবায়ু, পুষ্টিদূষণ ও প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব তুলনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভারমন্টের গবেষকেরা জীবনচক্র বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে এ গবেষণা পরিচালনা করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবর্জ্য ভাগাড়ে না পাঠিয়ে পুনর্ব্যবহার বা অন্য কোনো উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা হলে এর জলবায়ুগত প্রভাব ৮৯ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পানিতে অতিরিক্ত পুষ্টি জমে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মতো পরিবেশগত সমস্যাও কমতে পারে।

তবে খাদ্যবর্জ্য কম্পোস্ট করার ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নতুন ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে। গবেষকদের হিসাবে, কম্পোস্টে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিজমিতে বছরে প্রায় ২০ হাজার টন প্লাস্টিক দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণার প্রধান লেখক কেট পোর্টারফিল্ড বলেন, খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশগত প্রভাব হিসাব করা হয়েছে। তার মতে, বিপুল পরিমাণ খাদ্য প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো অবস্থায় নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়।

খাদ্যবর্জ্য পুনর্ব্যবহারের একটি পদ্ধতিতে যান্ত্রিক ‘ডিপ্যাকার’ ব্যবহার করে খাবার ও প্যাকেট আলাদা করা হয়। এরপর প্যাকেট ভাগাড়ে পাঠানো হয় এবং খাদ্যবর্জ্য কম্পোস্ট বা অ্যানারোবিক ডাইজেশনের মতো কাজে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, প্লাস্টিক আলাদা করার প্রযুক্তি ৯৯ শতাংশ কার্যকর হলেও খাদ্যবর্জ্য ভাগাড় থেকে সরিয়ে নেওয়ার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাধ্যমে মাটিদূষণ প্রায় ১০ গুণ বেড়ে যেতে পারে। কারণ মানুষ বা কোনো যন্ত্রই খাবার থেকে প্লাস্টিক শতভাগ আলাদা করতে পারে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খাবারে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যাপক ব্যবহার।

গবেষণার সহলেখক এরিক রয় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যে খাদ্যবর্জ্য ভাগাড়ে না পাঠানোর বিষয়ে উচ্চাভিলাষী নীতি রয়েছে। ২০২০ সাল থেকে সেখানে ‘ইউনিভার্সাল রিসাইক্লিং’ আইন পুরোপুরি কার্যকর হয়। এ আইনের আওতায় পরিবারের খাদ্যবর্জ্য ভাগাড়ে পাঠানো নিষিদ্ধ।

গবেষকদের মতে, ভারমন্টের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশজুড়ে একই ধরনের নীতি গ্রহণের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে এসব নীতি প্রণয়নের সময় খাদ্যবর্জ্যের পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এদিকে খাদ্যের অপচয় কমাতে গিয়ে প্লাস্টিক প্যাকেজিং কমানোর বিষয়টি নিয়েও জটিলতা রয়েছে। খাদ্যবর্জ্য নিয়ে কাজ করা সামাজিক উদ্যোগ সাসেক্স সারপ্লাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ফিল হলটাম বলেন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং সব সময় অপ্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে ছোট কৃষকের উৎপাদিত তাজা পণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে প্যাকেজিং প্রয়োজন হতে পারে।

পরিবেশকর্মীদের মতে, খাদ্যের অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার—দুই সমস্যাই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এজন্য খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করার ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষকেরা।

গবেষক কেট পোর্টারফিল্ডের মতে, এমন ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে মানুষকে বর্জ্য আলাদা করার বিষয়ে অতিরিক্ত ভাবতে না হয় এবং ভুলের সুযোগও কম থাকে।

গবেষকেরা একই সঙ্গে ‘উইশ রিসাইক্লিং’ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ কোনো বস্তু পুনর্ব্যবহারযোগ্য কি না নিশ্চিত না হয়েও রিসাইক্লিংয়ের বিনে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। তাদের মতে, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী বর্জ্য আলাদা করা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এমন বস্তু সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা—এসব অভ্যাসই সামগ্রিক বর্জ্য দূষণ কমাতে কার্যকর হতে পারে।

ইত্তেফাক/এমএএম