বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন জেলে আখের আলী খাঁ (৫৫)। ছেলে সোহেলকে (২০) সঙ্গে নিয়ে তিনি এ নদীতে ইলিশ শিকার করেন। নৌকা ও জাল কেনা এবং মেরামতের জন্য ইলিশের মৌসুম শুরুর আগেই ঋণ করেন। মৌসুমে চার-পাঁচ মাস ইলিশ শিকার করে মাছ বিক্রির আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করেন। বাকি অর্থে চলে সংসার।
তবে এবার যেন সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে আখের আলীর। তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর কোথায়, কখন এবং কতটা ইলিশ পাওয়া যায়—এসব তার নখদর্পণে। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে জাল ফেলেও এবার তেমন ইলিশের দেখা মিলছে না।
উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর তীরের চরবেড়েট গ্রামের বাসিন্দা আখের আলী খাঁ বলেন, তাদের এলাকাটি ইলিশের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার সেখানেও ইলিশের পরিমাণ খুব কম। ভরা মৌসুমের দুই মাস পেরিয়ে তৃতীয় মাস চললেও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় বড় দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
আখের আলী বলেন, ‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, সেটার কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর ওপর মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা রয়েছে। এখন কীভাবে এসব টাকা পরিশোধ করব, আর কীভাবে সংসার চালাব—সেই চিন্তাই সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে।’
আখের আলী খাঁর মতোই হতাশ বাউফল উপজেলার পাঁচ হাজারের বেশি ইলিশনির্ভর জেলে। তাদের ভাষ্য, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। নদীর নির্দিষ্ট এলাকায় জাল ফেললেই ইলিশ পাওয়ার কথা। কিন্তু কোথাও আশানুরূপ ইলিশ মিলছে না। এমনকি প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশের অভয়ারণ্যেও এবার প্রত্যাশিত মাছের দেখা নেই।
প্রতিবছর জুন থেকে ইলিশ আহরণের মৌসুম শুরু হয়ে চলে অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময় জেলেরা তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে রুপালি ইলিশের আশায় জাল ফেলেন। জেলার হাজারো জেলের জীবন-জীবিকা এই মৌসুমি ইলিশ আহরণের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে উপজেলায় ইলিশ আহরিত হয়েছে ৫১১ মেট্রিক টন। গত মৌসুমের একই সময়ে আহরণ হয়েছিল ৮৮৩ দশমিক ২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমের প্রথম দুই মাসে ইলিশ আহরণ কমেছে ৩৭২ দশমিক ২ মেট্রিক টন। উপজেলায় ইলিশনির্ভর জেলের সংখ্যা ৫ হাজার ৫২১ জন।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ করে তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকা ইলিশের অভয়ারণ্যে ভরা মৌসুমে প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পাওয়ায় তারা বিস্মিত। সরেজমিনে উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী চর মিয়াজান ও চরবেড়েট গ্রামে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। প্রায় প্রত্যেক জেলের কণ্ঠেই শোনা গেছে হতাশার সুর।
এসব জেলের অধিকাংশই দরিদ্র। ইলিশ মৌসুমের শুরুতে তারা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। অনেকে আড়তদারদের কাছ থেকে ইলিশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে দাদনও নিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে নৌকা ও জাল প্রস্তুত করেছেন তারা।
জেলে ইসতাক ভূঁইয়া (৪০) দুই সন্তান রাকিব (১০) ও সুমাইয়াকে (১২) নিয়ে চার সদস্যের পরিবার চালান। ছেলে-মেয়ে দুজনই স্কুলে পড়ে। মাছ ধরেই পরিবারের সব খরচ চালাতে হয় তাকে।
ইসতাক বলেন, ‘স্ত্রী রোজিনা বেগম এনজিও থেকে লোন আনছে। বাজারের আড়তদারদের কাছ থেকে ইলিশ দেওয়ার কথা কইয়া দাদন নিছি। হেই টাকা দিয়া নৌকা-জাল করছি। এখন এনজিওর কিস্তির টাকা, হের লগে মহাজনের দাদন। নদীতে গিয়া যে পরিমাণ ইলিশ পাই, তাতে সংসারই চলে না। ধারদেনা শোধ করুম কেমনে?’
ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে প্রতিবছর নভেম্বর মাসে তেঁতুলিয়া নদীর ওই ১০০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকেও ওই এলাকায় ব্যাপক নজরদারি চালানো হয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরতে না পারলে জেলেদের আরও সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ‘ইলিশের মৌসুম সবেমাত্র দুই মাস শেষ হয়েছে। আশা করি সামনের দিনগুলোতে নদীতে ইলিশ পাওয়া যাবে। জেলেরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে আমরা আশাবাদী।’

