দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে চাপের মুখে থাকা বিজেপি এবার ঝাড়খন্ডের রাঁচিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সামনে এনেছে। দিল্লির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর জবাবদিহির দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যেই ঝাড়খন্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে বিজেপি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সংসদ ভবন চত্বরে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও স্লোগানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে লোকসভা ও রাজ্যসভায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সংসদের কোনো কক্ষে উপস্থিত হননি। টানা তিন সপ্তাহ সংসদে বিরোধীদের মুখোমুখি না হয়ে মোদি ও শাহ এক বিরল নজির সৃষ্টি করলেন।
সরকারপক্ষ জানিয়েছে, অমিত শাহ ঝাড়খন্ডের ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দিতে প্রস্তুত। তবে বিরোধীরা বলেছে, শুধু দায়সারা বিবৃতি নয়, দিল্লির শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশকে পেলেট গানসহ বিভিন্ন ধরনের শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ কে দিয়েছিল, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। আগামী বৃহস্পতিবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা।
ঝাড়খন্ডে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে ঝাড়খন্ডের শিক্ষার্থীরা বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন করছেন। নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, অভিযুক্তদের শাস্তি এবং দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইয়ের হাতে দেওয়ার দাবিতে সোমবার তারা রাজ্য বিধানসভা ভবন অভিমুখে মিছিল করেন।
মিছিল ঠেকাতে পুলিশ জলকামান ও লাঠিচার্জ করে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের অন্যতম নেতা দেবেন্দ্র মাহাতো ১০ দিন ধরে অনশন করছেন। সোমবার তিনি অ্যাম্বুলেন্সে করে বিধানসভা অভিযানে অংশ নেন। পরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
এই ঘটনার পর মঙ্গলবার সংসদ ভবন চত্বরে বিজেপি ও এনডিএর সদস্যরা ঝাড়খন্ডের পুলিশি বলপ্রয়োগের প্রতিবাদ করেন এবং রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। তবে রাহুল গান্ধী ঝাড়খন্ড সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন। রাজ্যটিতে ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চার নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে কংগ্রেসও অংশীদার।
দিল্লির ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি
দিল্লিতে ২০ জুলাই শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দমনে পুলিশ, র্যাফ ও সিআরপিএফের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। বিরোধীরা এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করে আসছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীকে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিয়েছিলেন। তবে তিন সপ্তাহ পার হলেও তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাব দেননি বলে বিরোধীরা দাবি করছে। প্রধানমন্ত্রীও শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাননি।
এর বিপরীতে ঝাড়খন্ডের ঘটনাকে সামনে এনে বিজেপি রাহুল গান্ধীকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে। যদিও রাহুল নিজেই রাঁচিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছেন।
রাহুলের অবস্থান
রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘ঝাড়খন্ডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ভুল সিদ্ধান্ত। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। একমাত্র আলোচনার মধ্য দিয়েই সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে।’
তিনি ঝাড়খন্ড সরকারকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এক অনলাইন ‘আস্ক মি এনিথিং’ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে রাহুল বলেন, ‘দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করছেন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কোটা, দেরাদুন, এলাহাবাদে (প্রয়াগরাজ) আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও নিপীড়নমূলক। কেন্দ্রীয় সরকার, ঝাড়খন্ড সরকার বা কংগ্রেস সরকার, সবার উচিত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনা।’
সংসদে মুখোমুখি বিজেপি-কংগ্রেস
রাহুলের বক্তব্যের পরও সংসদ ভবন চত্বরে বিজেপি সদস্যরা তাকেই ঝাড়খন্ডের ঘটনার জন্য দায়ী করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা মোদি ও অমিত শাহর ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে পাল্টা স্লোগান দেন।
একপর্যায়ে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে সেখানে দেখা যায়। বিজেপি সদস্যরা তাকে রাহুলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, রাহুল পুলিশি বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছেন এবং ঝাড়খন্ডের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
আন্দোলনকারীদের মূল দাবি
ঝাড়খন্ড সরকার জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৮ শতাংশ দাবি ইতিমধ্যে মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে এখনো অমীমাংসিত অবস্থান রয়েছে।
একটি হলো নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে দেওয়া এবং অন্যটি হলো ঝাড়খন্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (জেএসএসসি) পরীক্ষা ও কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (সিজিএল) পরীক্ষা বাতিল করা।
এই দুই দাবি নিয়ে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। এদিকে বিজেপি রাজ্যে বিরোধী দল হিসেবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে এবং পুলিশি বলপ্রয়োগের প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
ফলে ঝাড়খন্ডের শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন শুধু রাজ্য সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দিল্লির সংসদীয় রাজনীতিতেও এটি বিজেপি ও কংগ্রেসের পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

