বাতাসে পোড়া গন্ধ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ছাই-কয়লা। আগুন গিলে খেয়েছে মিরপুরের চলন্তিকা ঝিলপাড় বস্তির কয়েক হাজার পরিবারের স্বপ্ন। এসব মানুষ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজছে অবশিষ্ট মালামাল। কেউ পোড়া খাট, টিভি, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-চোপড়, চুলা উদ্ধারের চেষ্টা করছে। আধপোড়া কিছু পাওয়া গেলে সেসব হয় ব্যবহার করবে, না হয় বিক্রি করে অন্তত দুই-এক দিনের খোরাক জোগাবে তারা। বস্তির ছাই-ভস্মের মধ্যে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষ গতকাল শনিবার এভাবেই খুঁজে বেড়াচ্ছিল তাদের পুড়ে যাওয়া মালামাল।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ভয়াবহ আগুনে বস্তির কয়েক হাজার ঘর ভস্মীভূত হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কবির (৩৫), হাবিব (১৯), রফিক (৪২) ও শরিফ (৩০) আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। তবে কেউই দগ্ধ কিংবা গুরুতর আহত হননি। আগুন লাগার ব্যাপারে বস্তিবাসীর অভিযোগ, এই বস্তিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। তারা ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছে। এদিকে এ ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাদের আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে মেয়র
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বস্তিতে আগুন লাগা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বসবাসের জন্য পার্শ্ববর্তী পাঁচটি স্কুল অস্থায়ীভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশন, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহায়তায় খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কার কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সেই বিবরণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। যত দিন ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষকে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা সম্ভব না হবে, তত দিন পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
চলন্তিকায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীরা ফ্ল্যাট পাবে জানিয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ২০০৭ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে বাউনিয়া বাঁধে বস্তিবাসীদের বসবাসের জন্য ১০ হাজার ফ্ল্যাট তৈরির প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। সেখানে চলন্তিকায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীরা ফ্ল্যাট পাবে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার সব বস্তিবাসীকে স্থানান্তর করা হবে।
আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, গতকাল পুরো বস্তিকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে ‘হাউজ টু হাউজ’ তল্লাশি করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কোনো মৃতদেহ পাননি। অগ্নিকাণ্ডের সঠিক তথ্য জানতে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অ্যাম্বুলেন্স) আবুল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, প্রাথমিক তদন্ত শেষে আগুন লাগার সঠিক কারণ জানা যায়নি। বস্তির লোকজনও সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। আর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫০০ থেকে ৬০০ ঘর পুড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মোট পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।
ষড়যন্ত্রের আগুন!
গতকাল চলন্তিকা বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পোড়া বস্তিতে এখন সব হারানো মানুষ আর্তনাদ করছে। ধ্বংসস্তূপে হাতড়ে বেড়াচ্ছে তারা। খুঁজে ফিরছে প্রয়োজনীয় কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। ঘটনার পরপরই যে যার মতো প্রাণ নিয়ে নিরাপদ স্থানে বের হয়ে যাওয়ায় কোনো জিনিসপত্র নিয়ে বের হতে পারেনি। ঈদের কারণে বস্তিতে থাকা বেশিরভাগ বাসিন্দা গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। আগুনের খবর পেয়ে অনেকেই ফিরে এসে দেখে, পোড়া ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই নেই।
এদিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা নয়, ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বস্তিবাসী। তারা বলছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে বস্তিতে আগুন লাগিয়েছে। বস্তির উত্তর-দক্ষিণ দিকের কিছু ঘরে পরিকল্পিতভাবে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা কেরোসিনের গন্ধও পেয়েছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বিঘা খাস জমিতে এই ঝিলপাড় বস্তি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা বস্তিতে ঘর বানিয়ে ভাড়া তুলে নিজেদের পকেটে ভরত। বস্তিটি অবৈধ, অনেক গ্যাস সংযোগও অবৈধ। তবে বৈদ্যুতিক সংযোগ বৈধ ছিল।
