র‍্যাবের টিএফআই সেলে পৈশাচিক নির্যাতন: ট্রাইব্যুনালে চিকিৎসকের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৩৬

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দিয়েছেন চিকিৎসক আশিক উল আকবর। মামলার ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে গিয়ে তিনি রোমহর্ষক ও নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

জবানবন্দিতে ডা. আশিক উল আকবর জানান, ২০১৬ সালে তিনি রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথি ছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন ও ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের সমাবেশে অংশ নেওয়ার কারণে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার জেরে ২০১৬ সালের ২৩ মে রাতে গাজীপুরের টঙ্গীতে তাঁর মামার বাড়ি থেকে সাদাপোশাকধারীরা তাঁকে তুলে নেয়।

নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাক্ষী জানান, বন্দিশালায় তাকে সারাক্ষণ চোখ বেঁধে ও পেছনের দিকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। খাওয়ার জন্য মাত্র এক হাতে হাতকড়া খোলা হতো, তবে পেছনে লাঠি হাতে পাহারা দেওয়া হতো। পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসল সারতে মাত্র তিন মিনিট সময় দেওয়া হতো এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে নেমে আসত বেধড়ক মারধর।

জিজ্ঞাসাবাদের নামে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে চরম শারীরিক নির্যাতন করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, একপর্যায়ে তার হাতের হাতকড়া খুলে গামছা দিয়ে বাঁধা হয় এবং সেই গামছার সঙ্গে হুক লাগিয়ে মেশিনের সাহায্যে তাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তার ওজন বেশি থাকায় ঝুলিয়ে রাখার ফলে দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। পরবর্তীতে নির্যাতনকারীদের একজন ‘ও অনেক মোটা, মরে যাবে’ বলার পর তাকে নামানো হয়। এরপরও অস্বীকার করায় তার দুই কানের লতিতে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়, যা তার কাছে মৃত্যুর মতো যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়েছিল।

অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ভয়ে একপর্যায়ে নির্যাতনকারীরা যা বলতে বলেছে, তিনি তাতেই রাজি হন। পরে একটি প্রিন্টেড কাগজে থাকা লেখা জোরপূর্বক সাদা কাগজে লিখিয়ে নেওয়া হয় এবং সেটির ভিডিও স্বীকারোক্তি ধারণ করা হয়। দুই মাস গুম থাকার পর তাকে একটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, জমটুপি ও হেলমেট পরিয়ে জনসমক্ষে আনা হয় এবং ২০১৬ সালের ২১ জুলাই টঙ্গী থানায় মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

দীর্ঘ ১৩ মাস কারাভোগের পর হাইকোর্টের আদেশে জামিনে মুক্তি পান এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ট্রাইব্যুনালে এই চিকিৎসক এই মামলার মূল হোতা শেখ হাসিনা, সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ জড়িত র‍্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

ইত্তেফাক/এএম